আমতলীতে ইয়াবাসহ সাবেক ছাত্রদল নেতাসহ আটক দুই

বরগুনার আমতলী পৌরসভা এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি বিশেষ অভিযানে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা ট্যাবলেট এবং মাদক বিক্রির নগদ অর্থসহ এক সাবেক ছাত্রদল নেতা ও তার সহযোগীকে হাতেনাতে আটক করেছে পুলিশ। উদ্ধারকৃত ইয়াবার মোট সংখ্যা ১ হাজার ৯০০ পিস, যার আনুমানিক বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা বলে পুলিশের দায়িত্বশীল পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে। মঙ্গলবার (৯ জুন) বিকেল ৫টার দিকে আমতলী পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্গত খোন্তাকাটা বটতলা এলাকায় এই সফল অভিযানটি পরিচালনা করা হয়। বরগুনা জেলা পুলিশের মাদকবিরোধী নিয়মিত ও বিশেষ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এই অভিযান চালানো হয়েছে।

আটককৃতদের পরিচয় ও রাজনৈতিক অবস্থান

পুলিশের বিশেষ অভিযানে আটক হওয়া দুই ব্যক্তির পরিচয় ও অবস্থান সুনির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত করেছে স্থানীয় থানা প্রশাসন। আটককৃতদের মধ্যে প্রধান অভিযুক্ত হলেন আবদুল্লাহ আল নোমান ওরফে জনি গাজী। তিনি বরগুনা জেলার আমতলী পৌরসভার নতুনবাজার বাঁধঘাট এলাকার বাসিন্দা মৃত গাজী আব্দুল জলিলের ছেলে। পুলিশি তদন্ত ও নথিপত্র অনুযায়ী, জনি গাজী আমতলী সাবেক পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তার এই রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে এলাকায় তার একটি বিশেষ পরিচিতি ছিল।

অভিযানে আটক হওয়া দ্বিতীয় ব্যক্তি হলেন সুজন হাওলাদার। তিনি মাদারীপুর জেলার লক্ষীগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা মৃত ইউনুস হাওলাদারের ছেলে। এই দুই ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধভাবে এই অঞ্চলে মাদক সরবরাহ, পরিবহন ও কেনাবেচার সাথে জড়িত ছিলেন বলে পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে।

গোপন সংবাদ ও পুলিশের বিশেষ অভিযান

আমতলী থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার বিকেলে খোন্তাকাটা বটতলা এলাকায় কতিপয় মাদক কারবারি নিষিদ্ধ মাদকের একটি বড় চালান হাতবদলের উদ্দেশ্যে অবস্থান করছে—এমন একটি নির্ভরযোগ্য ও গোপন সংবাদ আসে পুলিশের কাছে। এই সংবাদের ভিত্তিতে আমতলী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) কমল চন্দ্র দে এবং সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে থানা পুলিশের একটি চৌকস ও বিশেষ দল দ্রুত ওই এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে।

पुलिसের দলটি খোন্তাকাটা বটতলা এলাকায় পৌঁছালে সেখানে দুই ব্যক্তির অবস্থান ও সন্দেহজনক নড়াচড়া দেখে কর্তব্যরত কর্মকর্তাদের মনে তীব্র সন্দেহ জাগে। এরপর পুলিশ সদস্যরা চারপাশ থেকে ঘেরাও করে ওই দুই ব্যক্তিকে সন্দেহজনক অবস্থায় আটক করেন। পরবর্তীতে উপস্থিত স্থানীয় সাধারণ মানুষের সামনে তাদের শরীর ও সাথে থাকা ব্যাগ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তল্লাশি করা হয়।

মাদক ও নগদ অর্থ উদ্ধার

আটককৃত জনি গাজী ও সুজন হাওলাদারের দেহ তল্লাশি করার একপর্যায়ে তাদের হেফাজত থেকে নীল রঙের বায়ুনিরোধক প্যাকেটে মোড়ানো অবস্থায় সর্বমোট ১ হাজার ৯০০ পিস অবৈধ ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। উদ্ধার হওয়া এই বিপুল পরিমাণ ইয়াবার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী এই ধরনের মাদক দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর ও অবৈধ।

ইয়াবা ট্যাবলেটের পাশাপাশি মাদক বিক্রির অপরাধলব্ধ নগদ ৬০ হাজার ৬াত্ত টাকাও তাদের কাছ থেকে জব্দ করা হয়। পুলিশ জানায়, জব্দকৃত এই অর্থ তারা মূলত ওই দিনই বিভিন্ন খুচরা মাদক বিক্রেতা ও সেবীদের কাছে ইয়াবা বিক্রি করে সংগ্রহ করেছিল। উদ্ধারকৃত মাদক ও নগদ অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে আইনি প্রক্রিয়া মেনে উপস্থিত সাক্ষীদের সম্মুখে জব্দ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতিক্রিয়া

স্থানীয় বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, আমতলী পৌরসভার খোন্তাকাটা বটতলাসহ এর আশপাশের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই এই চিহ্নিত মাদক কারবারিদের অবৈধ তৎপরতা ও মাদক ব্যবসার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তারা এই এলাকায় একটি শক্তিশালী মাদক সিন্ডিকেট বা চক্র গড়ে তুলেছিল বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেন।

সাম্প্রতিক সময়ে আমতলী থানা পুলিশের ধারাবাহিক বিশেষ অভিযান এবং মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স বা কঠোর অবস্থান নেওয়ার কারণে সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি ফিরে এসেছে। তবে সাবেক পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিবের মতো একজন দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতার ইয়াবাসহ হাতেনাতে আটক হওয়ার এই খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর সমগ্র আমতলী উপজেলা ও স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য এবং আলোড়নের সৃষ্টি হয়েছে।

আমতলী থানার ওসির বক্তব্য ও আইনি পদক্ষেপ

এই সফল মাদকবিরোধী অভিযান এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রদান করেছেন আমতলী থানার বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু শাহাদাৎ মোহাম্মদ হাসনাইন পারভেজ। তিনি গণমাধ্যমকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে বলেন যে, এলাকায় মাদক নির্মূল, চাঁদাবাজি প্রতিরোধ, ইভটিজিং বন্ধ এবং চুরি-ডাকাতিসহ সর্বপ্রকার সামাজিক অপরাধ দমনে পুলিশের বিশেষ চিরুনি অভিযান পুরোদমে অব্যাহত রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে নিখুঁত পরিকল্পনা অনুযায়ী অভিযান চালিয়ে এই বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ দুই মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে।

ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরও উল্লেখ করেন যে, উদ্ধার হওয়া ১ হাজার ৯০০ পিস ইয়াবা ও নগদ টাকার সুনির্দিষ্ট জব্দতালিকা তৈরি করা হয়েছে। আটককৃত দুই আসামির বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় আমতলী থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়েরের আইনি প্রক্রিয়া দ্রুততার সাথে চলমান রয়েছে। মাদকের মতো সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে জেলা পুলিশের ঘোষিত ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতা নীতি ভবিষ্যতেও কঠোরভাবে বজায় থাকবে এবং এই চক্রের পেছনের অন্য কোনো মদদদাতা বা সহযোগী থাকলে তাদেরকেও খুঁজে বের করতে তদন্ত অব্যাহত থাকবে। আসামিদের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদালতে সোপর্দ করা হবে।