রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একসঙ্গে ছয়টি নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে। দায়েরকৃত এই ফৌজদারি মামলায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে সুস্পষ্টভাবে চিকিৎসায় অবহেলা জনিত কারণে মৃত্যুর অভিযোগ আনা হয়েছে। বুধবার (২৭ মে) রাতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) শেখ জাহিদুল ইসলাম গণমাধ্যমকে মামলার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন।
পুলিশের এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, মগবাজারের ওই বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় যে ছয়টি শিশু প্রাণ হারিয়েছে, তাদের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট নবজাতকের পরিবারের পক্ষ থেকে বাদী হয়ে রমনা থানায় এই মামলাটি দায়ের করা হয়। মামলার এজাহারে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চরম গাফিলতি, অব্যবস্থাপনা এবং যথাযথ চিকিৎসা সেবা প্রদানে অবহেলার কারণে নবজাতকের অকাল মৃত্যু ঘটেছে বলে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট এবং স্বজনদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ
এর আগে রাজধানীর মগবাজার এলাকার আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই ছয়টি নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনাটি ঘটে। একসঙ্গে এতগুলো শিশুর মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর হাসপাতাল প্রাঙ্গণে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। নিহত শিশুদের বাবা-মা এবং অন্যান্য নিকটাত্মীয়রা হাসপাতালের নিরাপত্তা ও সেবা ব্যবস্থা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
ভুক্তভোগী স্বজনদের পক্ষ থেকে আনিত অভিযোগে বলা হয়েছে, হাসপাতালের পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডের ভেতরে চরম অব্যবস্থাপনা বিদ্যমান ছিল। বিশেষ করে তীব্র গরমের মধ্যে ওয়ার্ডের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) দীর্ঘ সময় ধরে সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। ওয়ার্ডের পরিবেশ অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর ও প্রতিকূল হয়ে পড়েছিল এবং कर्तव्यরত চিকিৎসা কর্মকর্তা ও নার্সরা উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় চরম উদাসীনতা প্রদর্শন করেছেন। স্বজনদের দাবি, ওয়ার্ডের ভেতরের এই বৈরী পরিবেশ, এসি বন্ধ থাকা এবং যথাযথ তদারকির অভাবেই মূলত নবজাতকগুলো একে একে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
লাশ হস্তান্তর এবং ময়নাতদন্ত সংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়া
আইনি প্রক্রিয়া ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের অংশ হিসেবে, আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রাণ হারানো ছয়টি নবজাতকের মরদেহ ইতোমধ্যে তাদের নিজ নিজ পরিবারের নিকট বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। হাসপাতাল ও পুলিশ প্রশাসনের সমন্বয়ে মরদেহগুলো হস্তান্তরের প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা হয়।
| নবজাতক মৃত্যুর ঘটনা সংক্রান্ত সূচক | অফিসিয়াল ও আইনগত বিবরণ |
| घटनाর স্থান | পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ড, আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মগবাজার |
| নিহত নবজাতকের সংখ্যা | ০৬ (ছয়) জন |
| মামলা দায়েরের তারিখ | ২৭ মে ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ (বুধবার) |
| মামলা দায়েরের স্থান | রমনা থানা, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) |
| প্রাথমিক আইনি পদক্ষেপ | ময়নাতদন্ত ব্যতিরেকে লাশ হস্তান্তর এবং অবহেলার ধারায় মামলা রুজু |
| তদন্ত তদারককারী কর্মকর্তা | উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি), রমনা বিভাগ, ডিএমপি |
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সন্তানহারা পরিবারগুলো এই দুগ্ধপোষ্য ও ক্ষুদ্র শিশুদের মরদেহ নিয়ে পুনরায় কোনো আইনি জটিলতা বা ময়নাতদন্তের (পোস্টমর্টেম) মতো দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে চাননি। পরিবারের সদস্যরা আবেগঘন ও মানবিক দিক বিবেচনা করে ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট লিখিত আবেদন জানান।
পুলিশের পক্ষ থেকে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর ধর্মীয় অনুভূতি, মানসিক আঘাত ও আবেদনকে সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করা হয়। সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির পর যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এবং আবেদনের ভিত্তিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই প্রতিটি শিশুর মরদেহ তাদের বাবা-মায়ের নিকট বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।
পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এবং পরবর্তী আইনি তদন্ত
ডিএমপির রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) শেখ জাহিদুল ইসলাম মামলার পরবর্তী কার্যক্রম সম্পর্কে বিশদ ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। তিনি জানান, মামলাটি গ্রহণের পরপরই পুলিশ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে এর তদন্ত কাজ শুরু করেছে।
ডিসি শেখ জাহিদুল ইসলাম: “হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনাটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। আমরা একটি ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে দায়ের করা এজাহারের ভিত্তিতে অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে নিয়মিত মামলা নথিভুক্ত করেছি। যদিও পরিবারগুলোর অনুরোধে ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে, তবে দায়েরকৃত মামলার তদন্তে এটি কোনো বাধা সৃষ্টি করবে না। হাসপাতালের পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডের পরিবেশ কেমন ছিল, এসি সত্যিই বন্ধ ছিল কি না এবং চিকিৎসকদের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
রমনা থানা পুলিশ জানিয়েছে, মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে খুব শীঘ্রই হাসপাতালের ওই ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক, নার্স ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। একই সঙ্গে ওয়ার্ডের কারিগরি ত্রুটি ও এসি বন্ধ থাকার অভিযোগটি খতিয়ে দেখতে বিশেষজ্ঞ মতামত বা সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সংগ্রহ করা হচ্ছে। তদন্ত প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করে আদালতে একটি বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদন দাখিল করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে পুলিশ প্রশাসন।
