খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ই আগস্ট ২০২৬, ৪:৪৩ পিএম

অস্ট্রেলিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যকার টেস্ট সিরিজের প্রথম ম্যাচকে সামনে রেখে ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামের উইকেট নিয়ে কৌতূহল ক্রমেই বাড়ছে। প্রায় ২৩ বছর পর এই মাঠে আবার টেস্ট ক্রিকেট ফিরছে। ফলে ম্যাচ শুরুর আগেই আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে পিচের চরিত্র—ব্যাটসম্যানরা কতটা স্বাচ্ছন্দ্যে রান করতে পারবেন, নতুন বলে পেসাররা কতটা সহায়তা পাবেন এবং পাঁচ দিনের ম্যাচ যত এগোবে, উইকেটের আচরণ কতটা বদলাবে।
মারারা স্টেডিয়ামে এর আগে মাত্র দুটি টেস্ট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সর্বশেষ টেস্টটি হয়েছিল ২০০৩ সালে, যেখানে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ ছিল অস্ট্রেলিয়া। দীর্ঘ বিরতির পর একই ভেন্যুতে আবার দুই দল মুখোমুখি হওয়ায় পুরোনো স্মৃতির পাশাপাশি নতুন করে উইকেটের ধরন নিয়েও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আগের দুই টেস্টেই অবশ্য জয় পেয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষেও স্বাগতিকরা জিতেছিল, আর বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচটি তারা শেষ করেছিল ইনিংস ব্যবধানে জয় নিয়ে।
এবারের উইকেট নিয়ে মারারা স্টেডিয়ামের প্রধান কিউরেটর জ্যাক পাভলিচের বক্তব্যে আক্রমণাত্মক বা একতরফা পিচ তৈরির কোনো ইঙ্গিত নেই। তাঁর লক্ষ্য, এমন একটি মানসম্মত উইকেট প্রস্তুত করা যেখানে ব্যাটসম্যানরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী রান করতে পারবেন, আবার বোলাররাও সঠিক জায়গায় বল করে সাফল্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
পাভলিচের মতে, পিচে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন নেই। পাঁচ দিনের টেস্ট ক্রিকেটের উপযোগী একটি ধারাবাহিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ উইকেটই তাঁদের প্রত্যাশা। অর্থাৎ শুরু থেকেই ব্যাটসম্যানদের জন্য পরিস্থিতি খুব কঠিন করে তোলার পরিকল্পনা নেই। একই সঙ্গে বোলারদের পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করে দেওয়ার মতো ফ্ল্যাট উইকেটও তাঁরা চান না।
তবে ম্যাচের দিন যত গড়াবে, উইকেটের আচরণে কিছু পরিবর্তন আসতে পারে। পাভলিচের ধারণা, চতুর্থ ও পঞ্চম দিনে ব্যাটসম্যানদের জন্য পরিস্থিতি তুলনামূলক কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ফলে প্রথম দুই বা তিন দিনে রান করার সুযোগ বেশি থাকলেও ম্যাচের শেষ ভাগে বোলাররা বাড়তি সুবিধা পেতে পারেন। টেস্ট ক্রিকেটে এমন পরিবর্তনই ম্যাচের কৌশল ও উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়।
অস্ট্রেলিয়ার মাঠ মানেই পেস, বাউন্স ও গতির কথা মাথায় আসে। কিন্তু ডারউইনের মারারার ক্ষেত্রে প্রচলিত সেই ধারণা সরাসরি প্রয়োগ করতে নারাজ পাভলিচ। তাঁর বক্তব্য, অস্ট্রেলিয়ার প্রতিটি অঞ্চলের উইকেটের চরিত্র এক নয়। ভৌগোলিক অবস্থান, স্থানীয় আবহাওয়া, মাটির ধরন এবং মাঠের পরিবেশের কারণে বিভিন্ন ভেন্যুর পিচে স্বাভাবিকভাবেই পার্থক্য থাকে।
তাই ‘আদর্শ অস্ট্রেলিয়ান পিচ’ বলতে নির্দিষ্ট কোনো একটি ধরনকে বোঝানো কঠিন। মারারার জন্য তাঁর প্রত্যাশা বরং একটি ভালো ব্যাটিং উইকেট, যেখানে রান করার সুযোগ থাকবে এবং বোলারদেরও নিজেদের দক্ষতা, নিয়ন্ত্রণ ও ধৈর্যের মাধ্যমে উইকেট আদায় করতে হবে। এতে ম্যাচের ফল শুধু পিচের ওপর নির্ভর না করে ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্সের ওপরও নির্ভর করবে।
সাম্প্রতিক অস্ট্রেলিয়ান টেস্ট ক্রিকেটে অবশ্য দ্রুত ম্যাচ শেষ হওয়ার ঘটনাও দেখা গেছে। সর্বশেষ অ্যাশেজ সিরিজে পার্থ ও মেলবোর্নের টেস্ট মাত্র দুই দিনেই শেষ হয়েছিল। ফলে ডারউইনের ম্যাচেও এমন কিছু ঘটে কি না, তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই আলোচনা রয়েছে। তবে মারারার প্রধান কিউরেটর এমন কোনো সংক্ষিপ্ত ম্যাচ চান না। তাঁর প্রত্যাশা, উইকেট যেন অন্তত দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাট ও বলের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বজায় রাখে।
অবশ্য টেস্ট কত দিনে শেষ হবে, সেটি কোনো কিউরেটরের হাতে পুরোপুরি থাকে না। পিচ প্রস্তুত করার পর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় দুই দলের ক্রিকেটারদের হাতে। ব্যাটসম্যানরা কীভাবে বোলিং মোকাবিলা করবেন, পেসাররা নতুন বল কতটা কাজে লাগাতে পারবেন এবং স্পিনাররা ম্যাচের অগ্রগতিতে কতটা প্রভাব ফেলবেন—এসবই শেষ পর্যন্ত ম্যাচের গতিপথ নির্ধারণ করবে।
বাংলাদেশের জন্য এই ম্যাচে চ্যালেঞ্জ কম নয়। অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে পেস, বাউন্স ও ভিন্ন ধরনের বলের গতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে দীর্ঘ সময় ব্যাটিং করা সফরকারীদের জন্য বড় পরীক্ষা হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের বোলারদেরও ধৈর্য ধরে সঠিক জায়গায় বল করে অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপকে চাপে রাখতে হবে।
অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া নিজেদের ঘরের পরিবেশের সুবিধা কাজে লাগাতে চাইবে। মারারার উইকেট যদি শুরুতে ব্যাটিংয়ের জন্য ভালো হয়, তাহলে প্রথম ইনিংসে বড় রান তোলার সুযোগ কাজে লাগানো স্বাগতিকদের অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে। আর ম্যাচের শেষ দিকে উইকেটে যদি প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসে, তখন সেই পরিস্থিতি কাজে লাগানোর জন্য দুই দলকেই আগেভাগে পরিকল্পনা করতে হবে।
সব মিলিয়ে মারারার পিচ নিয়ে এখন পর্যন্ত যে বার্তা পাওয়া যাচ্ছে, তাতে একতরফা বোলিং উইকেট কিংবা রানবন্যার ফ্ল্যাট পিচ—কোনোটিই লক্ষ্য নয়। বরং ব্যাটসম্যানদের রান করার সুযোগ এবং বোলারদের দক্ষতা দিয়ে উইকেট নেওয়ার সম্ভাবনা—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখাই কিউরেটরদের পরিকল্পনা। দীর্ঘ ২৩ বছর পর মারারায় টেস্ট ক্রিকেট ফেরার দিনে সেই পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, তার উত্তর মিলবে মাঠেই।
মন্তব্য