জি- লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ৯ই আগস্ট ২০২৬, ৭:২৮ পিএম

এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন রামদয়াল সরকার। পরদিন সকালে ছিল তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ের ব্যবহারিক পরীক্ষা। পরীক্ষার হলে যাওয়ার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস—পরীক্ষার কেন্দ্রে যাওয়ার বদলে সড়ক দুর্ঘটনায় বাবার সঙ্গে প্রাণ হারিয়ে বাড়ি ফিরতে হলো ১৮ বছরের এই তরুণকে।
বগুড়ার ছিলিমপুর এলাকায় রোববার সকালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন রামদয়াল সরকার (১৮) ও তাঁর বাবা তাপস কুমার সরকার (৪৩)। একই দুর্ঘটনায় আরও একজন নিহত হয়েছেন। বাবা-ছেলের বাড়ি বগুড়ার শেরপুর পৌরসভার রামচন্দ্রপুর পাড়ায়। রামদয়াল শেরপুরের সামিট স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই তাঁর এইচএসসি পরীক্ষার কেন্দ্র ছিল। রোববার তাঁর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ের ব্যবহারিক পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল।
পরিবারের সদস্যদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, তাপস কুমার পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর দুটি ট্রাক ছিল। এর মধ্যে একটি ট্রাক তিনি নিজেই চালাতেন। শনিবার রাতে বগুড়ার ছিলিমপুর এলাকায় তাঁর একটি ট্রাক বিকল হয়ে যায়। ট্রাকটি মেরামতের প্রয়োজন হওয়ায় খবর পেয়ে রামদয়াল বাড়ি থেকে ৩০ হাজার টাকা নিয়ে বাবার কাছে যান। তখনও কেউ ভাবেননি, সেটিই বাবা-ছেলের শেষ দেখা হওয়ার রাত।
রাতের কোনো এক সময়ে সড়কের পাশে থেমে থাকা ট্রাকটিকে পেছন থেকে আরেকটি ট্রাক ধাক্কা দেয়। সংঘর্ষের সময় সেখানে থাকা তাপস কুমার, তাঁর ছেলে রামদয়ালসহ তিনজন নিহত হন। দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই স্বজনদের মধ্যে নেমে আসে শোকের ছায়া।
রোববার সকালে যে বাড়িতে ছেলের পরীক্ষায় যাওয়ার প্রস্তুতি থাকার কথা ছিল, সেখানে তখন স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড়। উৎসবমুখর হওয়ার কথা ছিল যে দিনটি, সেটিই পরিণত হয় শোকের দিনে। রামদয়ালের মা দিপালী রানী সরকার (৩৫) স্বামী ও একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন। চেতনা ফিরে পেলেই তাঁর মুখে ভেসে উঠছে একটাই আকুতি—‘আমার আর কেউ রইল না।’
তাপস কুমারের ৮০ বছর বয়সী বাবা আনন্দমোহন সরকারও নির্বাক হয়ে বসে ছিলেন। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ছেলে ও নাতিকে হারানোর শোক তাঁকে যেন বাকরুদ্ধ করে দিয়েছে। তিনি জানান, তাঁদের গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জের মোড়দিয়ায়। নাতিকে ভালোভাবে লেখাপড়া করানোর সুযোগ করে দিতে প্রায় ১৫ বছর আগে তাঁরা শেরপুরে এসে বসবাস শুরু করেছিলেন। সেই নাতিই ছিল পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁদের বড় স্বপ্নের কেন্দ্র। এখন ছেলে ও নাতি দুজনকেই হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন তিনি।
পরিবারের সদস্যরা জানান, আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর বাবা ও ছেলের মরদেহ তাঁদের গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হবে। সেখানে তাঁদের দাফন বা শেষকৃত্য সম্পন্ন করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
একটি সড়ক দুর্ঘটনা মুহূর্তেই একটি পরিবারের সব হিসাব বদলে দিয়েছে। রামদয়ালের সামনে ছিল পরীক্ষা, পড়াশোনা এবং ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন। বাবার সঙ্গে একটি বিকল ট্রাক মেরামতের কাজে গিয়ে সেই স্বপ্নেরই আকস্মিক সমাপ্তি ঘটল। তাঁর পরীক্ষার খাতা আর লেখা হলো না; বরং পরীক্ষার দিনেই পরিবারকে বহন করতে হলো তাঁর শেষযাত্রার ভার।
মন্তব্য