খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ই জুলাই ২০২৬, ৪:৪৩ পিএম

নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি সাদিক হোসেন (শুভ) নিহত হওয়ার ঘটনায় তাঁর পরিবার, সহকর্মী ও গ্রামের মানুষের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সাহসিকতা, নিষ্ঠা এবং পেশাদারিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ রাষ্ট্রীয় পদক পাওয়া এই তরুণ ডুবুরির মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, ফায়ার সার্ভিস বাহিনী এবং স্থানীয় মানুষের কাছেও এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
শুক্রবার রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কুমড়াকান্দি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সাদিকের বাড়িতে সকাল থেকেই আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী এবং বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা মানুষের ভিড়। শেষবারের মতো তাঁকে একনজর দেখতে মানুষের ঢল নামে। শোকাহত পরিবেশে স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী দৃশ্য ছিল তাঁর মা লিলি বেগমের আহাজারি। ছেলের অর্জিত রাষ্ট্রীয় পদকটি বুকে জড়িয়ে তিনি বারবার বিলাপ করছিলেন। তাঁর কান্নায় উপস্থিত অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, সাদিক হোসেন ছিলেন আশরাফ আলীর ছেলে। দায়িত্বশীল, বিনয়ী ও কর্মঠ মানুষ হিসেবে তিনি শুধু পরিবারের ভরসাই ছিলেন না, এলাকাতেও একজন সৎ ও সবার প্রিয় তরুণ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পরিবারের আর্থিক দায়িত্বের বড় অংশই তাঁর কাঁধে ছিল।
ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সকাল থেকে নারায়ণগঞ্জ শহরের নিতাইগঞ্জ ফায়ারঘাট এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীর একটি জেটির সামনে জমে থাকা কচুরিপানা পরিষ্কারের কাজ চলছিল। সকাল থেকেই উদ্ধারকর্মীরা দায়িত্ব পালন করছিলেন। বেলা ১১টার দিকে কাজের একপর্যায়ে সাদিক হোসেন নদীতে নিখোঁজ হন। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল এবং উদ্ধারকর্মীরা দ্রুত উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। কয়েক ঘণ্টা ধরে নদীর বিভিন্ন স্থানে অনুসন্ধান চালানোর পর সন্ধ্যা প্রায় সাতটার দিকে তাঁরই এক সহকর্মী ডুবুরি নদীর তলদেশ থেকে সাদিকের মরদেহ উদ্ধার করেন। দীর্ঘ প্রায় আট ঘণ্টার এই উদ্ধার অভিযান শেষে তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হলে সহকর্মীদের মধ্যেও নেমে আসে শোকের ছায়া।
পরিবার জানিয়েছে, ময়নাতদন্ত শেষে শুক্রবার ঢাকায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের প্রধান কার্যালয়ে তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে মরদেহ নিজ গ্রাম গোয়ালন্দে নিয়ে আসা হয়। বিকেল সাড়ে পাঁচটায় কুমড়াকান্দি ঈদগাহ মাঠে দ্বিতীয় জানাজা শেষে পৌর কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। জানাজায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ফায়ার সার্ভিসের সদস্য, আত্মীয়স্বজন এবং অসংখ্য সাধারণ মানুষ অংশ নেন।
মাত্র কয়েক বছরের চাকরিজীবনেই সাদিক হোসেন নিজের দক্ষতা ও সাহসিকতার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ২০২১ সালের ২৪ অক্টোবর বাহিনীতে যোগ দেন এবং নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দর ফায়ার স্টেশনে ডুবুরি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। নদী ও জলাশয়ে পরিচালিত বিভিন্ন উদ্ধার অভিযানে অসামান্য নিষ্ঠা, দক্ষতা এবং সাহসিকতার জন্য চলতি বছরের ১৯ মে তাঁকে প্রেসিডেন্ট ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স (সেবা) পদক প্রদান করা হয়। দায়িত্ব পালনের সময় সেই পদকপ্রাপ্ত সদস্যের মৃত্যুর ঘটনায় সহকর্মীদের মাঝেও গভীর শোক ও বেদনার সৃষ্টি হয়েছে।
সাদিকের মা লিলি বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, মাত্র দুই বছর আগে ছেলের বিয়ে দিয়েছিলেন। স্ত্রী সাদিয়া খাতুনকে নিয়ে সাদিকের ছোট্ট সংসার সুখেই চলছিল। তিনি বলেন, “আমার সাদিকের মতো ছেলে আর হবে না। এত ভালো ছেলে আমাকে ছেড়ে কীভাবে চলে গেল?”
তিনি আরও জানান, মাত্র তিন দিন আগে ছেলের সঙ্গে তাঁর ফোনে কথা হয়েছিল। সাদিক জানিয়েছিল, আগামী রোববার বাড়িতে আসবে। একই সময়ে বাবার জন্য পাঁচ হাজার টাকা পাঠানোর কথাও বলেছিল, কারণ তাঁর কাছে টাকা ছিল না। পরিবারের দাবি, সেই টাকাও পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু প্রতীক্ষিত সেই বাড়ি ফেরা আর হলো না।
সাদিক একজন প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ ডুবুরি হওয়ায় পানিতে ডুবে তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় প্রশ্ন তুলেছেন তাঁর মা। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়ে বলেন, কীভাবে এমন দুর্ঘটনা ঘটল, সেটি স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। পরিবারের সদস্যদের প্রত্যাশা, তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করা হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও গোয়ালন্দ পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর ফজলুল হক বলেন, সাদিক ছিলেন অত্যন্ত ভদ্র, সৎ এবং দায়িত্বশীল একজন মানুষ। তাঁর মতো তরুণ এলাকায় খুব কমই দেখা যায়। তিনি ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে বিভাগীয় তদন্তের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, সাদিক ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য। তাঁর অকাল মৃত্যুতে স্ত্রী ও পরিবারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। তাই সরকারের পক্ষ থেকে পরিবারের জন্য উপযুক্ত আর্থিক সহায়তা ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাদিক হোসেনের মৃত্যু আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা প্রতিদিন কতটা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করেন। অগ্নিকাণ্ড, নদী উদ্ধার অভিযান, দুর্ঘটনা কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁরা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ান। অনেক সময় তাঁদের সাহসিকতায় অসংখ্য প্রাণ রক্ষা পায়, আবার কখনও সেই দায়িত্ব পালনই তাঁদের জীবনের সবচেয়ে বড় মূল্য দাবি করে। রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত ডুবুরি সাদিক হোসেনের মৃত্যু সেই ত্যাগেরই এক বেদনাদায়ক স্মারক হয়ে থাকবে।
মন্তব্য