খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ই জুলাই ২০২৬, ৪:১৫ পিএম

রাজধানীর ডেমরা পুলিশ লাইন্সে কর্মরত এক তরুণ পুলিশ কনস্টেবলের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সহকর্মী, পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সাইদুল ইসলাম (২১) নামে ওই পুলিশ সদস্য আত্মহত্যা করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে প্রকাশ করা তার দীর্ঘ আবেগঘন বার্তা এবং ভিডিওটি এখন ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পোস্টটিতে ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েন, মানসিক যন্ত্রণা, ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন এবং গভীর হতাশার নানা ইঙ্গিত উঠে এসেছে।
শুক্রবার (১৭ জুলাই) ভোরে ডেমরা থানার অধীন ডেমরা পুলিশ লাইন্সের একটি বহুতল ভবনে এ ঘটনা ঘটে। অচেতন অবস্থায় সহকর্মীরা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে অবস্থার অবনতি হলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
হাসপাতালে উপস্থিত সাইদুল ইসলামের চাচা মো. সোহাগ জানান, প্রায় নয় মাস আগে তিনি বাংলাদেশ পুলিশে কনস্টেবল হিসেবে যোগ দেন। কর্মস্থল হিসেবে ডেমরা পুলিশ লাইন্সের ২০ তলা ভবনের নবম তলায় অবস্থান করছিলেন। পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেন, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে তিনি নিজ কক্ষে গলায় ফাঁস দেন। সহকর্মীরা বিষয়টি টের পেয়ে দ্রুত উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
ঘটনার আগে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে স্ত্রীকে নিয়ে তোলা পুরোনো কয়েকটি ছবি দিয়ে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন সাইদুল। সেই পোস্টে তিনি নিজের দাম্পত্য জীবনের ভাঙন, বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ, মানসিক অস্থিরতা এবং অসহায়ত্বের অনুভূতির কথা তুলে ধরেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, স্ত্রীকে ঘিরেই তিনি ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনেছিলেন। কিন্তু খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে বলে তিনি দাবি করেন।
নিজের অনুভূতির বর্ণনায় তিনি লেখেন, যেন উত্তাল সমুদ্রের মাঝখানে দিকহারা এক নাবিকের মতো তিনি পথ হারিয়ে ফেলেছেন। তার সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই বলেও উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, তার অপরাধ আসলে কী ছিল। ভালোবেসে সব বাধা অতিক্রম করে বিয়ে করাটাই কি তার সবচেয়ে বড় ভুল ছিল—এমন আক্ষেপও প্রকাশ করেন তিনি।
ফেসবুক পোস্টের বিভিন্ন অংশে সাইদুল দাবি করেন, সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য তিনি একাধিকবার সুযোগ দিয়েছেন, ক্ষমা করেছেন এবং স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে আজীবনের অঙ্গীকার হিসেবে ধরে রাখতে চেয়েছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই সম্পর্ক টেকেনি। তিনি আরও লেখেন, কাউকে হারানোর ভয় থেকেই তিনি সম্পর্ককে আঁকড়ে ধরে রাখতে চেয়েছিলেন, অথচ সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি।
পোস্টের শেষাংশে বাবা-মায়ের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে মানসিক যন্ত্রণা বহন করার শক্তি তার আর অবশিষ্ট নেই। নিজেকে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া একজন মানুষ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি নিজের অসহায় অবস্থার কথাও তুলে ধরেন।
সাইদুল ইসলামের মৃত্যুর পর তার ফেসবুক পোস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাটি ঘিরে নানা আলোচনা শুরু হয়। অনেকেই ব্যক্তিগত সম্পর্কের সংকট, মানসিক চাপ এবং হতাশার মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে মানসিক কষ্টে ভোগা কোনো ব্যক্তি যদি হতাশা, অসহায়ত্ব বা জীবন সম্পর্কে নেতিবাচক ইঙ্গিত দেন, তবে পরিবার, বন্ধু ও সহকর্মীদের তা গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া উচিত। সময়মতো মানসিক সমর্থন এবং প্রয়োজনীয় পেশাদার সহায়তা অনেক ক্ষেত্রেই সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক মোহাম্মদ ফারুক চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে সাইদুল ইসলামের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট থানাকে অবহিত করা হয়েছে এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে প্রয়োজনীয় তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দেয়, মানসিক স্বাস্থ্য শারীরিক স্বাস্থ্যের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিগত সংকট, সম্পর্কের টানাপোড়েন কিংবা দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের লক্ষণ দেখা দিলে তা উপেক্ষা না করে পরিবারের সদস্য, বিশ্বস্ত বন্ধু বা বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন। সময়মতো আন্তরিক সহমর্মিতা ও সহযোগিতা অনেক মূল্যবান জীবন রক্ষা করতে পারে।
মন্তব্য