খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩ই জুলাই ২০২৬, ৫:১৫ পিএম

এবিএম জাকিরুল হক টিটন
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কেবল অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করা মানুষের ইতিহাস নয়; এটি একটি জাতির সম্মিলিত আত্মত্যাগ, প্রতিরোধ এবং অস্তিত্ব রক্ষার ইতিহাস। এই ইতিহাসকে কেবল নিবন্ধিত যোদ্ধার সংখ্যা কিংবা প্রশাসনিক তালিকার হিসাব দিয়ে বিচার করা যায় না।
সম্প্রতি বির্তকিত লেখক মহিউদ্দিন আহমদের দৈনিক প্রথমআলো পত্রিকায় একটি লেখায় মুক্তিযোদ্ধা ও রাজাকারদের সংখ্যা এবং তাঁদের ভূমিকা নিয়ে যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, তা অনেকের মধ্যেই গভীর প্রশ্ন ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে যদি এমন ব্যাখ্যা থেকে এই ধারণা তৈরি হয় যে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি বড় অংশ প্রকৃত যোদ্ধা ছিলেন না, অথবা পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী রাজাকারদের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে কম অপরাধমূলক ছিল, তবে তা মুক্তিযুদ্ধের প্রতিষ্ঠিত ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেই প্রতীয়মান হয়।
১৯৭১ সালে যুদ্ধক্ষেত্রে যারা অস্ত্র হাতে লড়েছেন, তাঁরা যেমন মুক্তিযোদ্ধা, তেমনি সীমান্তের শরণার্থী শিবিরে থেকে প্রশিক্ষণের অপেক্ষায় থাকা তরুণ, মুক্তাঞ্চলে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহকারী সাধারণ মানুষ, মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় ও খাদ্য জুগিয়েছেন যাঁরা, পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতনের মুখে জীবন দিয়েছেন অসংখ্য নারী-পুরুষ, তাঁদের আত্মত্যাগও মুক্তিযুদ্ধের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া এক কোটিরও বেশি মানুষ যুদ্ধ থেকে পালিয়ে যাননি; তাঁরা পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর গণহত্যা থেকে প্রাণ বাঁচাতে বাধ্য হয়েছিলেন দেশ ছাড়তে। সেই শিবিরগুলোতে রোগ, অপুষ্টি ও দুর্ভোগে অগণিত মানুষের মৃত্যু হয়। তাঁদের দুর্ভোগও মুক্তিযুদ্ধের মূল্য।
মুক্তিযুদ্ধের সময় অসংখ্য গ্রামে মানুষ মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেওয়ার অপরাধে হত্যা হয়েছেন। অসংখ্য গণকবর আজও সেই নির্মমতার সাক্ষ্য বহন করছে। প্রায় তিন লক্ষ নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ রয়েছে। অসংখ্য ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক ও সাধারণ মানুষ অস্ত্র হাতে কিংবা অস্ত্র ছাড়াই স্বাধীনতার সংগ্রামে নিজেদের উৎসর্গ করেছেন।
শহীদ শফি ইমাম রুমির মতো তরুণ বিদেশে নিরাপদ ভবিষ্যৎ ছেড়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। আবার অজস্র নাম-না-জানা কিশোর, কৃষক ও শ্রমিক জীবন দিয়েছেন দেশের জন্য। তাঁদের অবদানকে কেবল আনুষ্ঠানিক তালিকার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা যায় না।
একইভাবে রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও শান্তি কমিটির ভূমিকা সম্পর্কে বাংলাদেশের ইতিহাসে বিস্তর গবেষণা, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য এবং বিচারিক নথি রয়েছে। পাকিস্তানি বাহিনীর সহায়ক এই বাহিনীগুলোর একটি অংশ গণহত্যা, নির্যাতন, ধরিয়ে দেওয়া এবং লুটপাটে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল—এ বিষয়টি ইতিহাসে সুপ্রতিষ্ঠিত।
ইতিহাসের পুনর্মূল্যায়ন অবশ্যই হতে পারে। গবেষণাও প্রশ্ন তুলতে পারে। কিন্তু সেই প্রশ্ন যদি এমন ধারণা সৃষ্টি করে যে মুক্তিযুদ্ধের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল ছিল, অথবা মুক্তিযোদ্ধা ও রাজাকারদের ভূমিকার মধ্যে নৈতিক সমতা টানা যায়, তাহলে তা জাতির স্মৃতি ও আত্মত্যাগ সম্পর্কে বিভ্রান্তির জন্ম দিতে পারে।
মুক্তিযুদ্ধ কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়; এটি সমগ্র বাঙালি জাতির অর্জন। তাই এর ইতিহাস নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু সেই বিতর্ক হওয়া উচিত তথ্য, দলিল, প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য এবং প্রমাণের ভিত্তিতে। কারণ ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা মানে কেবল নতুন প্রশ্ন তোলা নয়, বরং সত্যকে যথাসম্ভব নির্ভুলভাবে তুলে ধরা।
যে ত্রিশ লক্ষ শহীদ, অগণিত নির্যাতিত নারী, লক্ষ লক্ষ শরণার্থী এবং অসংখ্য নাম-না-জানা মুক্তিকামী মানুষের রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশের জন্ম, তাঁদের আত্মত্যাগকে কখনোই পরিসংখ্যানের সংকীর্ণ অঙ্কে সীমাবদ্ধ করা যায় না। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জাতির আত্মপরিচয়ের ইতিহাস; তাকে বিকৃত না করে, তথ্যসমৃদ্ধ ও দায়িত্বশীলভাবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের সবার কর্তব্য।
মন্তব্য