জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

ফিতরা কার ওপর, কত ও কেন !

পবিত্র রমজান মাসের সমাপ্তিতে মুসলমানদের জন্য যে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ইবাদত নির্ধারিত হয়েছে, তা হলো সদকাতুল ফিতর বা ফিতরা। এটি শুধু একটি দান বা সাহায্য নয়; বরং রোজার পরিপূর্ণতা, আত্মশুদ্ধি এবং সমাজের দরিদ্র মানুষের প্রতি দায়িত্ব পালনের একটি অপরিহার্য বিধান। ১৪৪৭ হিজরি সনের (২০২৬ সাল) জন্য জাতীয় সাদাকাতুল ফিতর নির্ধারণ কমিটি জনপ্রতি ফিতরার হার ঘোষণা করেছে। চলতি বছর ফিতরার সর্বনিম্ন হার নির্ধারণ করা হয়েছে ১১০ টাকা এবং সর্বোচ্চ হার ২ হাজার ৮০৫ টাকা।

শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, ১ শাওয়াল অর্থাৎ ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিকের সময় যেসব মুসলমানের কাছে মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকবে, তাদের ওপর ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব। মৌলিক প্রয়োজন বলতে বোঝানো হয়—নিজের ও পরিবারের বসবাসের ঘর, প্রয়োজনীয় পোশাক, দৈনন্দিন ব্যবহার্য আসবাবপত্র, কর্মজীবনের উপকরণ এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য অপরিহার্য সামগ্রী। এসব বাদ দিয়ে যদি কোনো ব্যক্তির কাছে নিসাব পরিমাণ অর্থ, স্বর্ণ-রূপা বা সম্পদ থাকে, তাহলেই তার ওপর ফিতরা আবশ্যক হবে।

ফিতরা ও জাকাত—দুটিই আর্থিক ইবাদত হলেও এর বিধানে কিছু পার্থক্য রয়েছে। জাকাতের ক্ষেত্রে শর্ত হলো, নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিকানা পূর্ণ এক বছর থাকতে হবে এবং তার ওপর ২.৫ শতাংশ হারে জাকাত আদায় করতে হবে। কিন্তু ফিতরার ক্ষেত্রে এক বছর পূর্ণ হওয়ার শর্ত নেই। ঈদের দিন ভোরে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলেই ফিতরা দিতে হবে, এমনকি সেই সম্পদ যদি আগের দিনই অর্জিত হয় তবুও।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, “নিশ্চয়ই সফলকাম সে, যে আত্মশুদ্ধি অর্জন করে।” (সুরা আলা, আয়াত ১৪)। ইসলামি ব্যাখ্যায় এ আত্মশুদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে সদকাতুল ফিতরের কথা উল্লেখ করা হয়। হাদিস শরিফে সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) সদকাতুল ফিতর ফরজ করেছেন—এর পরিমাণ এক ‘সা’ যব বা এক ‘সা’ খেজুর; ছোট-বড়, স্বাধীন-পরাধীন সকল মুসলমানের ওপরই এটি ওয়াজিব (সহিহ বুখারি, হাদিস ১৫১২)।

ফিতরার মূল তাৎপর্য দুটি। প্রথমত, রোজা রাখার সময় অনিচ্ছাকৃত ভুল, অসতর্ক কথা বা আচরণ থেকে যে ত্রুটি সৃষ্টি হয়, তা পূরণ করা। দ্বিতীয়ত, সমাজের দরিদ্র ও অসহায় মানুষ যেন ঈদের দিন খাদ্যের অভাবে কষ্ট না পায়, সে ব্যবস্থা করা। সাহাবি ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, সদকাতুল ফিতর রোজাদারের জন্য শুদ্ধিকরণ এবং দরিদ্র মানুষের খাদ্যসংস্থানের উদ্দেশ্যে নির্ধারিত (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ১৬০৯)।

চলতি বছরে ঢাকার জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়ার ফতোয়া বিভাগ জানিয়েছে, ৫২.৫ ভরি রুপার বাজারমূল্যের ভিত্তিতে জাকাত ও ফিতরার নিসাব নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা। অর্থাৎ, ঈদের দিন ভোরে যদি কারও কাছে এই পরিমাণ অর্থ বা সম্পদের মালিকানা থাকে, তবে তার ওপর ফিতরা ওয়াজিব হবে। জাকাতের ক্ষেত্রে একই পরিমাণ সম্পদ পূর্ণ এক বছর থাকলে জাকাত দিতে হবে।

খাদ্যদ্রব্যের ভিত্তিতে ফিতরার পরিমাণ নির্ধারণে ‘সা’ পরিমাপ অনুসরণ করা হয়। এক সা সাধারণত আনুমানিক ৩.৩ কেজির সমান, আর গম বা আটার ক্ষেত্রে অর্ধেক সা, অর্থাৎ প্রায় ১.৬৫ কেজি ধরা হয়। জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়ার হিসাব অনুযায়ী খাদ্যভিত্তিক ফিতরার পরিমাণ নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো—

খাদ্যদ্রব্যপরিমাণফিতরার হার
কিসমিস৩.৩ কেজি২৮০০ টাকা
পনির৩.৩ কেজি২৬৫০ টাকা
খেজুর৩.৩ কেজি২০০০ টাকা
যব৩.৩ কেজি৪৫০ টাকা
গম বা আটা১.৬৫ কেজি১০০ টাকা

তবে জাতীয় কমিটির ঘোষিত সর্বনিম্ন ফিতরা ১১০ টাকা হওয়ায় বাজারদরের সঙ্গে সামান্য পার্থক্য দেখা যেতে পারে। এজন্য আলেমরা পরামর্শ দিয়েছেন, নিজ নিজ এলাকার বাজারমূল্য বিবেচনা করে ফিতরা আদায় করা উত্তম।

ফিতরা আদায়ের সময়সীমা রমজানের শেষ দিনের সূর্যাস্তের পর থেকে ঈদের নামাজের আগ পর্যন্ত। তবে দরিদ্রদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে ঈদের এক বা দুই দিন আগেও ফিতরা প্রদান করা জায়েজ। ইচ্ছাকৃতভাবে ঈদের নামাজের পর ফিতরা দিলে তা সদকাহ হিসেবে গণ্য হবে, ফিতরার পূর্ণ সওয়াব পাওয়া যাবে না।

ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলিম শুধু নিজের পক্ষ থেকে নয়, তার অধীনস্থ অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের পক্ষ থেকেও ফিতরা আদায় করবেন। এর মাধ্যমে সমাজে সাম্য, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার বন্ধন সুদৃঢ় হয়।

সর্বোপরি, ফিতরা কেবল আর্থিক দায় নয়; এটি রোজার পূর্ণতা, আত্মশুদ্ধি এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুশাসন। যথাসময়ে সঠিক পরিমাণে ফিতরা আদায় করলে একদিকে যেমন ইবাদত পূর্ণতা পায়, অন্যদিকে তেমনি অভাবী মানুষের ঘরেও ঈদের আনন্দ পৌঁছে যায়।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর