খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১ই জুলাই ২০২৬, ৭:৩০ পিএম

একসময়ের আঞ্চলিক সংগীত আজ বহু বিলিয়ন ডলারের এক বৈশ্বিক সাম্রাজ্য। দক্ষিণ কোরিয়ার নিজস্ব সংস্কৃতি থেকে উঠে আসা কে-পপ (কোরিয়ান পপ) এখন বিশ্ব সংগীত ও ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম নিয়ন্ত্রক। ১৯৯২ সালে সিও তাইজি অ্যান্ড বয়েজের হাত ধরে যে বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল, ২০২৬ সালে এসে তা এক অপ্রতিরোধ্য বৈশ্বিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। নিচে কে-পপের এই মহাকাব্যিক যাত্রার মূল মাইলফলকগুলো তুলে ধরা হলো:
Table of Contents
১৯৯২ সালে ‘সিও তাইজি অ্যান্ড বয়েজ’ গ্রুপটি কোরিয়ার ঐতিহ্যবাহী সংগীতে এক অভাবনীয় পরিবর্তন নিয়ে আসে। তারা কোরিয়ান ভাষার গানের সঙ্গে প্রথমবারের মতো হিপহপ, র্যাপ, রক ও পাশ্চাত্য পপের এক জাদুকরি মিশ্রণ ঘটায়। শুধু সুরেই নয়, তরুণদের জীবনযুদ্ধ, সামাজিক ট্যাবু ও প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর উঠে আসে তাদের গানে। সংগীত সমালোচকদের মতে, এখান থেকেই মূলত আধুনিক কে-পপের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়।
এই সফলতার ওপর ভিত্তি করে ১৯৯৬ সালে ‘এসএম এন্টারটেইমেন্ট’ গঠন করে ‘হাই-ফাইভ অব টিনএজার’ (এইচওটি) গ্রুপ। এটিই ছিল কে-পপ ইতিহাসের প্রথম দল, যাদের কঠোর ও সুনির্দিষ্ট প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিখুঁত ‘আইডল’ হিসেবে প্রস্তুত করা হয়। তাদের সিঙ্ক্রোনাইজড নাচ, জাঁকজমকপূর্ণ ফ্যাশন ও ভক্তদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ বজায় রাখার কৌশলটি পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আদর্শ মডেলে পরিণত হয়। এর পরপরই, ১৯৯৯ সালে ‘গ্রুভ ওভার ডোজ’ (জিওডি) তাদের ‘টু মাদার’ গান দিয়ে বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। ব্যালাড ও র্যাপের মিশেলে তৈরি তাদের সাধারণ জীবনের গল্প সব বয়সী শ্রোতাকে টেনেছিল। বিভিন্ন রিয়েলিটি শোতে অংশ নিয়ে তারা প্রমাণ করে যে, একজন কে-পপ আইডলের পরিধি কেবল মঞ্চের গানেই সীমাবদ্ধ নয়।
২০০০ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে একক শিল্পী হিসেবে পা রাখেন বোয়া (BoA)। কোরিয়ান, জাপানি ও ইংরেজি ভাষার ওপর চমৎকার দখলের কারণে তিনি জাপানের বিখ্যাত ‘অরিকন চার্ট’-এর শীর্ষে ওঠা প্রথম কোরিয়ান নারী শিল্পী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তাঁর অ্যালবাম স্থান পায় মার্কিন বিলবোর্ড ২০০-তেও। এরপর ২০০৩ সালে আত্মপ্রকাশ করে ‘টিভিএক্সকিউ’। জোরালো কণ্ঠ ও নিখুঁত নাচের জন্য দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠা এই দলটি ২০০৯ সালে জাপানের টোকিও ডোমের কনসার্টের সব টিকিট নিমেষেই বিক্রি করে দেয়। পরবর্তীতে তাদের ‘বিগিন এগেইন’ সফরে রেকর্ড ১০ লাখ টিকিট বিক্রি হয়েছিল।
২০০৫ সালে ‘সরি, সরি’ গান দিয়ে বিশ্বজুড়ে তুমুল উন্মাদনা তৈরি করে ‘সুপার জুনিয়র’। বিশেষ করে এশিয়ার প্রতিটি প্রান্তে এই গানের হুক-স্টেপ নাচটি ছড়িয়ে পড়ে। পরের বছরই, ২০০৬ সালে আত্মপ্রকাশ ঘটে ‘বিগব্যাং’-এর। নিজেদের গান নিজেরাই লেখা ও সুর করার অভিনব বৈশিষ্ট্যের কারণে তারা অন্য সব দল থেকে আলাদা হয়ে ওঠে। ‘হারু হারু’ বা ‘ফ্যান্টাস্টিক বেবি’র মতো কালজয়ী গান দিয়ে তারা কে-পপকে ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে যায়।
২০০৮ সালে ‘ওয়ান্ডার গার্লস’ তাদের ‘নোবডি’ গানের ইংরেজি সংস্করণ দিয়ে বিলবোর্ড হট ১০০-এ জায়গা করে নেয়, যা ছিল যেকোনো কে-পপ দলের জন্য প্রথম। যদিও এই সাফল্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, তবে তারা মার্কিন বাজারে কে-পপের সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়। এর ঠিক পরপরই, ২০০৯ সালে ‘গার্লস জেনারেশন’ তাদের ‘জি’ (Gee) গান দিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় দীর্ঘ সময় এক নম্বরে থাকার রেকর্ড গড়ে এবং ‘জাতীয় গার্ল গ্রুপ’ খেতাব পায়। একই বছর ‘শাইনি’ (SHINee) তাদের তীক্ষ্ণ কোরিওগ্রাফি ও পরীক্ষামূলক সংগীতের মাধ্যমে পারফরম্যান্সনির্ভর কে-পপের এক নতুন ধারা তৈরি করে। আর ২০১১ সালে ‘টোয়েন্টিওয়ান’ (2NE1) তাদের ‘আই অ্যাম দ্য বেস্ট’ গান দিয়ে বিশ্বজুড়ে এক সাহসী ও হিপহপ ঘরানার নারীশক্তির জোয়ার নিয়ে আসে।
২০১২ সালটি ছিল কে-পপের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট। একক শিল্পী সাই (PSY)-এর ‘গ্যাংনাম স্টাইল’ বিশ্বজুড়ে এক সুনামি তৈরি করে। এটিই ছিল ইতিহাসের প্রথম ভিডিও যা ইউটিউবে এক বিলিয়ন (১০০ কোটি) ভিউয়ের মাইলফলক স্পর্শ করে এবং বিলবোর্ড হট ১০০-এ দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসে। এই একটি গানই কে-পপকে বৈশ্বিক মূলধারার বিনোদনে স্থায়ী আসন করে দেয়।
ডিজিটাল পাইরেসির যুগে ২০১৩ সালে ‘এক্সো’ (EXO) তাদের প্রথম অ্যালবাম ‘এক্সওএক্সও’ এক মিলিয়নের বেশি কপি বিক্রি করে এক নতুন রেকর্ড গড়ে। কোরিয়া ও চীনের বাজারের জন্য তাদের আলাদা ইউনিট গঠনের কৌশলটি দারুণ সফল হয়। ২০১৫ সালে আত্মপ্রকাশ করা ‘টোয়াইস’ (Twice) তাদের ‘চিয়ার আপ’ ও ‘টিটি’ গানের মাধ্যমে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে ব্যাপক পপ-সংস্কৃতি গড়ে তোলে।
এরপর আসে ‘বিটিএস’ (BTS) ও ‘ব্ল্যাকপিংক’ (BLACKPINK)-এর যুগ, যা কে-পপকে বিশ্বের এক নম্বর সংগীতে রূপান্তর করে। ২০১৯ সালে বিখ্যাত ‘কোচেলা’ মিউজিক ফেস্টিভ্যালে প্রথম কে-পপ গ্রুপ হিসেবে পারফর্ম করে ব্ল্যাকপিংক। আন্তর্জাতিক তারকাদের সঙ্গে কাজ এবং ইউটিউবে ১০ কোটি সাবস্ক্রাইবারের মাইলফলক তাদের শীর্ষস্থানে বসায়। অন্যদিকে, ২০২০ সালে ‘বিটিএস’ প্রথম কে-পপ দল হিসেবে গ্র্যামি মনোনয়ন পেয়ে ইতিহাস গড়ে। তাদের ‘ডায়নামাইট’ গানটি বিলবোর্ড হট ১০০-এর শীর্ষস্থান দখল করে। তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য ও জীবনের গল্প নিয়ে তৈরি তাদের গান বিশ্বজুড়ে ‘আর্মি’ নামক এক বিশাল ও অনুগত ভক্তগোষ্ঠী তৈরি করেছে।
চতুর্থ প্রজন্মের শীর্ষ দল হিসেবে ‘স্ট্রে কিডস’ ২০২৫ সালে তাদের অ্যালবাম দিয়ে টানা অষ্টমবারের মতো বিলবোর্ড ২০০-এর শীর্ষে অভিষেক ঘটিয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে। ২০২৬ সালের বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে ‘অল ডে প্রজেক্ট’-এর মতো পঞ্চম প্রজন্মের দলগুলো পারফরম্যান্স, ফ্যাশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মিশেলে বৈশ্বিক উপস্থিতির নতুন মানদণ্ড তৈরি করছে। একসময়ের ছোট্ট একটি দেশের স্থানীয় সংগীত আজ বিশ্ব সংস্কৃতির অন্যতম প্রভাবশালী চালিকাশক্তি।
কে-পপের দীর্ঘ পথচলার গুরুত্বপূর্ণ বছর ও মাইলফলকগুলোর পরিসংখ্যান নিচে দেওয়া হলো:
| বছর | শিল্পী/গ্রুপের নাম | অর্জিত মূল মাইলফলক ও সাফল্য |
| ১৯৯২ | সিও তাইজি অ্যান্ড বয়েজ | হিপহপ ও পাশ্চাত্য পপের মিশ্রণে আধুনিক কে-পপের সূচনা। |
| ১৯৯৬ | এইচওটি (H.O.T.) | কঠোর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রথম নিয়মতান্ত্রিক ‘আইডল’ সংস্কৃতি তৈরি। |
| ১৯৯৯ | জিওডি (g.o.d) | ‘টু মাদার’ গানের ব্যাপক সাফল্য ও রিয়েলিটি শোতে জনপ্রিয়তা। |
| ২০০০ | বোয়া (BoA) | জাপানের অরিকন চার্টের শীর্ষে ওঠা প্রথম কোরিয়ান নারী শিল্পী। |
| ২০০৩ | টিভিএক্সকিউ (TVXQ) | জাপানের টোকিও ডোমের কনসার্টের সব টিকিট বিক্রির রেকর্ড। |
| ২০০৫ | সুপার জুনিয়র | ‘সরি, সরি’ গানের মাধ্যমে এশিয়াজুড়ে তুমুল নাচ ও গান উন্মাদনা। |
| ২০০৬ | বিগব্যাং | নিজেদের গান নিজেরা লিখে কে-পপে স্বকীয়তার ধারা তৈরি। |
| ২০০৮ | ওয়ান্ডার গার্লস | ‘নোবডি’ গান দিয়ে বিলবোর্ড হট ১০০-এ প্রবেশ করা প্রথম দল। |
| ২০০৯ | গার্লস জেনারেশন | ‘জি’ গানের ঐতিহাসিক রেকর্ড এবং ‘জাতীয় গার্ল গ্রুপ’ খেতাব। |
| ২০০৯ | শাইনি | তীক্ষ্ণ কোরিওগ্রাফি ও পরীক্ষামূলক সংগীতের নতুন ধারা। |
| ২০১১ | টোয়েন্টিওয়ান | ‘আই অ্যাম দ্য বেস্ট’ গান দিয়ে আন্তর্জাতিক সাহসী নারী ঘরানার উত্থান। |
| ২০১২ | সাই (PSY) | ‘গ্যাংনাম স্টাইল’ দিয়ে ইউটিউবে প্রথম ১ বিলিয়ন ভিউয়ের বিশ্বরেকর্ড। |
| ২০১৩ | এক্সো | ডিজিটাল যুগে ‘এক্সওএক্সও’ অ্যালবামের ১ মিলিয়নের বেশি কপি বিক্রি। |
| ২০১৫ | টোয়াইস | ‘চিয়ার আপ’ ও ‘টিটি’ দিয়ে কোরিয়া ও জাপানে পপ সংস্কৃতির জোয়ার। |
| ২০১৯ | ব্ল্যাকপিংক | কোচেলায় প্রথম পারফর্ম ও ইউটিউবে ১০ কোটি সাবস্ক্রাইবারের রেকর্ড। |
| ২০২০ | বিটিএস | প্রথম কে-পপ দল হিসেবে গ্র্যামি মনোনয়ন ও বিলবোর্ড শীর্ষস্থান জয়। |
| ২০২৫ | স্ট্রে কিডস | টানা অষ্টমবারের মতো বিলবোর্ড ২০০ চার্টের শীর্ষে অভিষেকের রেকর্ড। |
| ২০২৬ | পঞ্চম প্রজন্ম (যেমন: অল ডে প্রজেক্ট) | ফ্যাশন, মেটাভার্স ও বৈশ্বিক উপস্থিতিতে নতুন মানদণ্ড নির্ধারণ। |
মন্তব্য