খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২ই জুলাই ২০২৬, ১১:৫৬ পিএম

আন্তর্জাতিক বাজারে সুদের হারের আকস্মিক ওঠানামা জনিত ঝুঁকি থেকে আমদানিকারকদের সুরক্ষাকবচ দিতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় আমদানি ঋণ গ্রহণকারীরা ব্যাংকের সঙ্গে সুনির্দিষ্ট চুক্তির মাধ্যমে ভবিষ্যতের জন্য আগাম সুদের হার নির্ধারণ করে নেওয়ার সুযোগ পাবেন। নতুন এই ‘ফরওয়ার্ড রেট এগ্রিমেন্ট’ সুবিধার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সুদের হারের পরিবর্তনের কারণে আমদানিকারকদের ব্যবসায়িক ব্যয় বা খরচ বৃদ্ধির যে অনিশ্চয়তা তৈরি হতো, তা অনেকটাই কমে আসবে।
২ জুলাই (বৃহস্পতিবার) বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এই নতুন নীতিমালার কথা জানানো হয়েছে। নতুন এই সিদ্ধান্তটি দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য সচল রাখতে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
Table of Contents
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, সরবরাহকারী ঋণ (সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট) এবং ক্রেতা ঋণের (বায়ার্স ক্রেডিট) আওতায় ইউজেন্স বা ডেফার্ড (বিলম্বে মূল্য পরিশোধের শর্তে) ভিত্তিক আমদানির ক্ষেত্রে এই সুবিধা কার্যকর হবে। বাংলাদেশের অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকগুলো বিদেশী মুদ্রায় আমদানি ঋণ গ্রহণকারী গ্রাহকদের চাহিদার ভিত্তিতে এই ধরনের বিশেষ চুক্তি করতে পারবে।
বিশ্ববাজারে বর্তমানে মানদণ্ডভিত্তিক সুদের হার, বিশেষ করে ‘সিকিউরড ওভারনাইট ফাইন্যান্সিং রেট’ বা এসওএফআর (SOFR) প্রতিনিয়ত ওঠানামা করছে। এর ফলে দেশের আমদানিকারকেরা পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে বড় ধরনের আর্থিক লোকসান বা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন। নতুন এই উদ্যোগের ফলে ব্যবসায়ীরা এখন থেকে আগেভাগেই তাদের সুদের হার নির্দিষ্ট করে নিজেদের অর্থায়ন ব্যয় বা ফাইন্যান্সিং কস্ট সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারবেন। এতে করে পণ্যের উৎপাদন বা বিপণন খরচ নির্ধারণ করাও তাঁদের জন্য সহজ হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এই ফরওয়ার্ড রেট চুক্তি কেবল ঝুঁকি প্রশমন বা হেজিংয়ের উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করা যাবে। এটিকে অবশ্যই প্রকৃত ও বৈধ আমদানি লেনদেনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে হবে। এই সুবিধার আড়ালে কোনো ধরনের ফটকাবাজি (স্পেকুলেশন) বা অরক্ষিত অবস্থান গ্রহণের বিন্দুমাত্র সুযোগ থাকবে না।
নতুন এই ব্যবস্থায় ভবিষ্যতের নির্দিষ্ট কোনো মেয়াদের জন্য একটি সুদের হার আগে থেকেই ঠিক করা থাকবে। পরবর্তীতে যখন ঋণের অর্থ পরিশোধের সময় আসবে, তখন চুক্তিকৃত সুদের হার এবং ওই সময়ে বিশ্ববাজারে প্রচলিত আসল সুদের হারের যে পার্থক্য তৈরি হবে, তার ভিত্তিতেই দুই পক্ষের মধ্যে আর্থিক নিষ্পত্তি বা লাভ-ক্ষতির সমন্বয় সম্পন্ন হবে।
এই প্রক্রিয়ায় যেন ব্যাংকগুলো কোনো ধরনের বড় আর্থিক ঝুঁকিতে না পড়ে, সেজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিছু কঠোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নির্দেশনা বেঁধে দিয়েছে। ব্যাংকগুলোকে এই ধরনের চুক্তি থেকে তৈরি হওয়া ঝুঁকি একই দিনে সমান্তরাল লেনদেনের (ব্যাক-টু-ব্যাক বা অফসেটিং ট্রানজেকশন) মাধ্যমে সম্পূর্ণভাবে সমন্বয় করে নিতে হবে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, ব্যাংকগুলো যেন নিজেদের হিসাবে কোনো ধরনের বাজারঝুঁকি বহন না করে।
আমদানিকারকদের স্বার্থ সুরক্ষায় এবং ব্যাংকগুলো যেন অতিরিক্ত মুনাফা করতে না পারে, সেজন্য মূল্য নির্ধারণে ব্যাংকের মার্জিন সর্বোচ্চ ১০ ভিত্তি পয়েন্ট বা বেসিস পয়েন্টের (Basis Points) মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কোনো একটি নির্দিষ্ট ব্যাংকের মোট ফরওয়ার্ড রেট চুক্তির সর্বোচ্চ সীমাও বেঁধে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো ব্যাংকের মোট ফরওয়ার্ড রেট চুক্তির পরিমাণ তার বিগত ১২ মাসের গড় মাসিক বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহের (ফরেন কারেন্সি ইনফ্লো) ২৫ শতাংশের বেশি হতে পারবে না।
একই সঙ্গে এই সার্কুলারে আন্তর্জাতিক মানসম্মত চুক্তি কাঠামোর ব্যবহার, দৈনিক বাজারমূল্যায়ন (মার্ক-টু-মার্কেট) এবং শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। কোনো কারণে যদি চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তা সমাপ্ত করতে হয়, তবে তা প্রচলিত বাজারদরে নিষ্পত্তি করতে হবে এবং এই সংক্রান্ত সমস্ত নথিপত্র ও দলিল ভবিষ্যতের নিরীক্ষার জন্য সংরক্ষণ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন প্রজ্ঞাপন থেকে পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ নিয়মাবলী ও নির্দেশনাসমূহ নিচে একটি তালিকার মাধ্যমে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
| ক্রমিক | নীতিমালা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মূল বিষয়সমূহ | প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী নির্ধারিত শর্ত ও সীমা |
| ১ | প্রজ্ঞাপন জারির সুনির্দিষ্ট তারিখ | ২ জুলাই, ২০২৬ |
| ২ | যেসব আমদানি ঋণের ক্ষেত্রে এই সুবিধা মিলবে | সরবরাহকারী ঋণ ও ক্রেতা ঋণ (ইউজেন্স ভিত্তিক) |
| ৩ | চুক্তির মূল উদ্দেশ্য ও আইনি পরিধি | কেবল ঝুঁকি প্রশমন বা হেজিং (ফটকাবাজি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ) |
| ৪ | আন্তর্জাতিক সুদের হারের যে মানদণ্ডকে বিবেচনা করা হয়েছে | এসওএফআর (SOFR) এবং অনুরূপ মানদণ্ড |
| ৫ | মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যাংকের সর্বোচ্চ মার্জিন সীমা | ১০ ভিত্তি পয়েন্ট বা বেসিস পয়েন্ট (Basis Points) |
| ৬ | ব্যাংকের জন্য মোট চুক্তির সর্বোচ্চ লেনদেন সীমা | বিগত ১২ মাসের গড় মাসিক বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহের ২৫% |
| ৭ | ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি সমন্বয়ের সময়সীমা | একই দিনে (সেম ডে অফসেটিং লিকুইডেশন) |
| ৮ | আগাম চুক্তি সমাপ্তির ক্ষেত্রে নিষ্পত্তির নিয়ম | প্রচলিত বাজারদরের (Market Rate) ভিত্তিতে নিষ্পত্তি |
| ৯ | চুক্তি সম্পাদনের জন্য অনুমোদিত ব্যাংক | অনুমোদিত ডিলার বা এডি (AD) শাখা সমূহ |
| ১০ | নথিপত্র সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা | চুক্তিসংশ্লিষ্ট সকল দলিলের বাধ্যতামূলক সংরক্ষণ |
মন্তব্য