জিলাইভ [ GLive ] | truth alone triumphs

কনস্টেবল থেকে তারকা, প্রশান্ত তামাং এর অসমাপ্ত যাত্রা

২০০৭ সাল দার্জিলিং পাহাড়ের আধুনিক সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক হয়ে আছে। সে সময় পাহাড়ে যে আবেগ, ঐক্য ও সম্মিলিত গর্বের বিস্ফোরণ ঘটেছিল, তার পেছনে কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন বা সামাজিক অস্থিরতা ছিল না। ছিল এক তরুণের স্বপ্নপূরণ—পাহাড়ের সন্তান, কলকাতা পুলিশের কনস্টেবল প্রশান্ত তামাংয়ের উত্থান। তিনি তখন ইন্ডিয়ান আইডল-এর তৃতীয় আসরের গ্র্যান্ড ফাইনালে পৌঁছেছেন। মাত্র ২৫ বছর বয়সে গোর্খা সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি ভারতের সবচেয়ে বড় বিনোদনমঞ্চে নিয়মিত ও দৃশ্যমান উপস্থিতি গড়ে তোলেন, যা আগে কখনো ঘটেনি।

দার্জিলিং ও পার্বত্য অঞ্চলের নানা প্রান্তে শুরু হয় অভূতপূর্ব উদযাপন। সামাজিক সমাবেশ, প্রার্থনাসভা, তহবিল সংগ্রহ এবং ভোট দেওয়ার জন্য গণআহ্বান—সব মিলিয়ে প্রশান্ত তামাংয়ের লড়াই ব্যক্তিগত সাফল্যের সীমা ছাড়িয়ে এক সামাজিক আন্দোলনের রূপ নেয়। বিচারকদের কাছ থেকে একাধিকবার সমালোচনা এলেও দর্শকের বিপুল ভোট ও সমর্থন শেষ পর্যন্ত নির্ধারক হয়ে ওঠে। বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে প্রশান্ত কেবল একটি রিয়েলিটি শোর ট্রফি জেতেননি; তিনি দীর্ঘদিন মূলধারার সংস্কৃতিতে উপেক্ষিত একটি জনগোষ্ঠীর স্বীকৃতি ও আত্মমর্যাদার প্রতীক হয়ে ওঠেন।

জয়ের পর প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম অ্যালবাম ‘ধন্যবাদ’। পাশাপাশি ‘বীর গোর্খালি’ গানটি পাহাড়ের মানুষের আবেগ, ইতিহাস ও আত্মপরিচয়ের ভাষা হয়ে ওঠে। এই সাফল্য তাঁর জীবনের গতিপথ আমূল বদলে দেয়। পুরস্কার হিসেবে পাওয়া এক কোটি টাকার অর্থ তাঁকে সংগীত ও অভিনয়ের জগতে পূর্ণকালীনভাবে আত্মপ্রকাশের সুযোগ করে দেয়। ২০১০ সালে নেপালি ভাষার চলচ্চিত্র ‘গোর্খা পল্টন’-এর মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক ঘটে তাঁর। এরপর ‘আংগালো মায়া কো’, ‘কিনা মায়া মা’, ‘নিশানি’, ‘পরদেশি’সহ একাধিক ছবিতে অভিনয় করে তিনি নেপালি চলচ্চিত্রাঙ্গনে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। টেলিভিশন ও ডিজিটাল মাধ্যমেও কাজ করে নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে।

তবে এই উত্থান দীর্ঘস্থায়ী হলো না। গত রোববার নয়াদিল্লির বাসভবনে মাত্র ৪৩ বছর বয়সে প্রশান্ত তামাংয়ের মৃত্যু হয়। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত জটিলতায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে। স্ত্রী গীতা থাপা তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নিলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন। তিনি রেখে গেছেন মা, দুই বোন—অর্চনা ও অনুপমা—এবং স্ত্রীকে।

তাঁর মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শোকবার্তায় তিনি বলেন, জাতীয় খ্যাতিসম্পন্ন এই শিল্পীর আকস্মিক প্রয়াণ অত্যন্ত বেদনাদায়ক। বিনোদনের জগতের বাইরেও প্রশান্ত তামাং গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনের সামাজিক ইতিহাসে এক নীরব অনুপ্রেরণার নাম। বিশেষ করে ২০০৭ ও ২০১৭ সালের আন্দোলনের সময় তিনি পাহাড়ের মানুষের আশা ও আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন।

তুংসুংয়ে বেড়ে ওঠা এক সাধারণ ছেলের জীবনগাথা এটি—শৈশবে বাবাকে হারিয়ে স্কুল ছাড়তে বাধ্য হওয়া, কলকাতা পুলিশের ব্যান্ডে গান গাওয়া, সেখান থেকে জাতীয় পরিচিতি পাওয়া। প্রশান্ত তামাং তাই কেবল একজন গায়ক বা অভিনেতা নন; তিনি একটি প্রজন্মের স্বপ্ন, সংগ্রাম ও আত্মপরিচয়ের প্রতিচ্ছবি। তাঁর যাত্রা অসমাপ্ত হলেও, পাহাড়ের মানুষের স্মৃতিতে ও ইতিহাসে তিনি চিরস্থায়ী হয়ে থাকবেন।

প্রশান্ত তামাং: সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জি

বিষয়তথ্য
জন্মস্থানতুংসুং, দার্জিলিং
পেশাগায়ক, অভিনেতা
বড় সাফল্যইন্ডিয়ান আইডল (তৃতীয় আসর) বিজয়
চলচ্চিত্র অভিষেকগোর্খা পল্টন (২০১০)
মৃত্যু৪৩ বছর বয়সে
মৃত্যাস্থাননয়াদিল্লি
Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

Recent News