খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১ই জুলাই ২০২৬, ৪:৩২ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে চলমান কূটনৈতিক তৎপরতার মাঝেই নতুন অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এখনই কোনো উচ্চপর্যায়ের সরাসরি বৈঠকে বসছে না ইরান। মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছানো ওয়াশিংটনের শীর্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। এর ফলে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা আরও জটিল ও অনিশ্চিত হয়ে পড়ল।
ইরানের কর্মকর্তাদের মতে, আলোচনার টেবিলে বসার আগে দুই সপ্তাহ আগে হওয়া প্রাথমিক যুদ্ধবিরতির শর্তগুলো পুরোপুরি চূড়ান্ত করতে হবে। এই কাঠামোগত বিষয়গুলোর সুরাহা হওয়ার পরই কেবল পারমাণবিক কর্মসূচির সীমাবদ্ধতাসহ অন্যান্য জটিল দ্বিপাক্ষিক বিষয় নিয়ে কথা হতে পারে। তেহরানের এই অনড় অবস্থান ইঙ্গিত দেয় যে, প্রাথমিক সমঝোতার মূল বিষয়গুলোতেই দুই পক্ষের মধ্যে এখনও বড় ধরনের দূরত্ব রয়ে গেছে।
খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী, ইরানকে কিছু অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে হরমুজ প্রণালিতে তাদের কঠোর নিয়ন্ত্রণ কিছুটা শিথিল করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে পৌঁছাতে ৬০ দিনের একটি সময়সীমা ধরে আলোচনার পরিকল্পনা রয়েছে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ইতিমধ্যে দোহার কূটনৈতিক মঞ্চে হাজির হয়েছেন। হোয়াইট হাউস একে বড় ধরনের কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখালেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। কাতার ও ইরান উভয়েই নিশ্চিত করেছে, মার্কিন প্রতিনিধিরা সরাসরি ইরানি কর্মকর্তাদের মুখোমুখি হচ্ছেন না। কাতার এর মধ্যস্থতা করছে। কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল-থানি ইতিমধ্যে মার্কিন প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পরোক্ষ আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, আগামী দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো বৈঠকের সময়সূচি নির্ধারিত নেই। তবে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি কিছুটা আশার বাণী শুনিয়ে বলেছেন, দুই দেশের মধ্যে নিম্ন পর্যায়ের কৌশলগত আলোচনা শুরু হওয়ার একটি সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এই কূটনৈতিক অচলাবস্থা কাটাতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের কথা ভাবছেন। তিনি প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং জয়েন্ট চিফসভ অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনের সঙ্গে নতুন করে সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনাও করেছেন। তবে রয়টার্স স্বাধীনভাবে এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেনি। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ট্রাম্প এখনই চূড়ান্ত সামরিক সিদ্ধান্তে না গিয়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে আরও কিছু সময় দিতে চান। যদিও জনসমক্ষে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন।
যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে কিছুদিন বন্ধ থাকার পর বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আবার আংশিক জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। এই সংকট শুরুর আগে বিশ্ববাজারের মোট তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়েই পরিবহন করা হতো। ইরান দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালির সার্বভৌম অধিকার তাদের এবং ওমানের। প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেন, এই জলপথে জাহাজ চলাচলের নিয়ম নির্ধারণের অধিকার শুধু তাদেরই। ৬০ দিনের সময়সীমা শেষ হলে আগামী আগস্টের মাঝামাঝি থেকে এই পথ ব্যবহারকারী প্রতিটি বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে ইরান ফি বা শুল্ক আদায় শুরু করবে।
তবে ওয়াশিংটন এই দাবির তীব্র বিরোধিতা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইরানকে কোনো অবস্থাতেই আন্তর্জাতিক এই নৌপথ থেকে অর্থ আদায় করতে দেওয়া হবে না। একটি সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, এই অঞ্চলে তেল পরিবহন প্রায় স্বাভাবিক হয়ে এসেছে এবং কোনো কোনো দিন তা যুদ্ধের আগের পরিমাণকেও ছাড়িয়ে গেছে। অবশ্য এর পক্ষে তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান দেখাননি।
যুদ্ধের এই চরম অনিশ্চয়তার মধ্যেও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কিছুটা কমেছে। সম্প্রতি বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন হামলার জেরে মার্কিন বাহিনী ইরানের সামরিক স্থাপনায় বিমান হামলা চালায়। জবাবে ইরানও কুয়েত ও বাহরাইনে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিল। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (আঙ্কটাড) জানিয়েছে, জ্বালানি বাজারে সাময়িক স্বস্তি এলেও দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলোতে এখনও খাদ্য ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির বড় ঝুঁকি রয়েছে। এই সংঘাত বিশ্বজুড়ে নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়িয়েছে। পাশাপাশি আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী কংগ্রেস নির্বাচনকে সামনে রেখে ঘরের মাঠে রাজনৈতিক চাপে পড়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। পরিস্থিতি সামাল দিতে ট্রাম্প ও মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জ্বালানি বিক্রেতাদের পেট্রোলের দাম কমানোর জন্য তাগিদ দিচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই সম্ভাব্য চুক্তির ওপর লেবাননে ইসরায়েল এবং ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর মধ্যকার যুদ্ধ বন্ধের বিষয়টিও নির্ভর করছে। তবে লেবাননের পার্লামেন্ট স্পিকার ও হিজবুল্লাহর মিত্র নাবিহ বেরি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া পৃথক একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ওই খসড়া চুক্তিতে দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টিকে হিজবুল্লাহর সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের শর্তের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এই জটিল শর্তের কারণে পুরো অঞ্চলের শান্তি প্রক্রিয়া আরও দীর্ঘায়িত ও কণ্টকাকীর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
মন্তব্য