খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ই জুলাই ২০২৬, ১১:৩৭ পিএম

ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত ও ক্ষণস্থায়ী যুদ্ধবিরতির অবসান ঘটিয়ে নতুন করে শুরু হওয়া মার্কিন হামলা ওয়াশিংটনের জন্য বড় ধরনের কৌশলগত সংকট তৈরি করছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রায় পাঁচ মাস ধরে চলা এই যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রধান অস্ত্রের মজুদে টান পড়তে শুরু করেছে। বর্তমান তীব্রতায় হামলা অব্যাহত থাকলে এই সংকট আরও ঘনীভূত হবে। এটি প্রকারান্তরে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীন কিংবা উত্তর কোরিয়ার মতো পরাশক্তিদের মোকাবিলায় মার্কিন সামরিক সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের বরাতে এই উদ্বেগের কথা জানিয়েছে।
থিংক ট্যাংক ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’ (সিএসআইএস)-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত এপ্রিল মাসে যখন সাময়িকভাবে যুদ্ধ বন্ধ হয়েছিল, তত দিনেই পেন্টাগন তাদের অত্যাধুনিক থাড ($THAAD$) ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইন্টারসেপ্টরের অন্তত অর্ধেক ব্যবহার করে ফেলেছে। এছাড়া প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টরের প্রায় অর্ধেক এবং অত্যন্ত কার্যকর টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের অন্তত ৩০ শতাংশ ইতিমধ্যে এই যুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে।
থিংক ট্যাংকের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক এবং অবসরপ্রাপ্ত মেরিন কর্পস কর্নেল মার্ক কানসিয়ান জানান, যেভাবে যুদ্ধ চলছে, তা যদি এই হারেই চলতে থাকে তবে অস্ত্রের মজুদ এতটাই কমে যাবে যে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে মার্কিন সামরিক শক্তির জন্য একটি বড় ধরনের ঘাটতি ও উচ্চতর ঝুঁকির স্তর তৈরি হবে। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের পররাষ্ট্রনীতি গবেষণা প্রধান মাইকেল ও’হানলনও স্বীকার করেছেন যে মার্কিন অস্ত্রের মজুদ বর্তমানে প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষয়ে যাওয়া অস্ত্রভাণ্ডার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া রাতারাতি সম্ভব নয়। পেন্টাগনের বর্তমান সরবরাহ সূচি অনুযায়ী, প্রতি মাসে মাত্র ১৫টি নতুন টমাহক এবং ২০টি নতুন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র যুক্ত হচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ২০২৬ সালে নতুন করে কোনো থাড ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের পূর্বানুমান নেই।
সিএসআইএস-এর ধারণা, মার্কিন অস্ত্রের মজুদ ইরান যুদ্ধের আগের স্তরে ফিরিয়ে নিতে ৩ বছর বা তার বেশি সময় লেগে যেতে পারে। আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো এলেন ম্যাককাস্কার জানান, বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের ঘাটতি পূরণ করতে ২ থেকে ৫ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যাবে।
এই সংকটের মাঝেও ট্রাম্প প্রশাসন নতুন অস্ত্র তৈরির জন্য তহবিল জোগাড় করতে মার্কিন কংগ্রেসের দিক থেকে বড় ধরনের বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সাথে যুক্ত অবসরপ্রাপ্ত দুই তারকা জেনারেল জন ফেরারি জানান, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ক্ষয়ে যাওয়া একটি ক্ষেপণাস্ত্রও প্রতিস্থাপনের জন্য কংগ্রেস এখন পর্যন্ত কোনো বাড়তি অর্থ বরাদ্দ দেয়নি।
সংকট উত্তরণে ট্রাম্প প্রশাসন প্রতিরক্ষা শিল্পের উৎপাদন দ্রুত বাড়ানোর চেষ্টা করছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ত্বরান্বিত করতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত জুনে ‘ডিফেন্স প্রোডাকশন অ্যাক্ট’ প্রয়োগ করেন। এছাড়া বৈশ্বিক চাপ কমাতে জার্মানি এবং ইউক্রেনের মতো সহযোগী দেশগুলোকে অভ্যন্তরীণভাবে প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। অতি সম্প্রতি তুরস্কে ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে ট্রাম্প ইউক্রেনের জন্য এই লাইসেন্স চুক্তির ঘোষণা দেন।
তবে লাইসেন্স দিলেই রাতারাতি উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব নয়। জাপানে একটি প্যাট্রিয়ট কারখানা তৈরি করতে তিন বছর সময় লেগেছিল। এমনকি ২০২২ সালে উৎপাদন লাইনের কাজ শুরু করার পরও জার্মানি এখনও একটিও প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে সরবরাহ করতে পারেনি। ফলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসী যুদ্ধংদেহী নীতির সাথে তাল মিলিয়ে মার্কিন সামরিক বাহিনী কতদিন এই সরবরাহ ঘাটতি সামাল দিতে পারবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
মন্তব্য