খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ই জুলাই ২০২৬, ১১:২২ পিএম

নরসিংদীর রায়পুরার মেথিকান্দা রেলস্টেশনের প্রবীণ ও পরিচিত পরিচ্ছন্নতাকর্মী ববি বেগম (৭০) হত্যা এবং তার কষ্টের জমানো টাকা লুটের মামলায় গ্রেপ্তার পাঁচ আসামির তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।
রোববার (১২ জুলাই) আসামিদের নরসিংদীর আদালতে হাজির করে মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) দিলীপ চন্দ্র সরকার। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে নরসিংদীর বিজ্ঞ বিচারক মেশকাতুল ইসলাম পাঁচ আসামির প্রত্যেকের তিন দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর আগে ববি বেগমের ওপর বর্বরোচিত হামলা ও টাকা লুটের এই ঘটনায় ভৈরব রেলওয়ে থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়।
লোমহর্ষক এই হত্যাকাণ্ডের পর অপরাধীদের ধরতে মাঠে নামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক দল। গত শুক্রবার রায়পুরা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় যৌথ অভিযান চালায় স্থানীয় থানা পুলিশ, রেলওয়ে পুলিশ এবং র্যাব-১১। অভিযানে এই হত্যাকাণ্ডের সাথে সরাসরি জড়িত পাঁচ আসামিকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়।
পরে এক সংবাদ সম্মেলনে র্যাব-১১-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ মাসুদ পারভেজ সাংবাদিকদের সামনে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, মেথিকান্দা স্টেশনের সিসিটিভি ফুটেজ এবং তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় আসামিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মাধ্যমে জানা যায়, ববি বেগমের জীবনের গল্পটি অত্যন্ত বেদনাবিধুর। প্রায় ২৫ বছর আগে বাকপ্রতিবন্ধী এক নারী ট্রেনে চড়ে মেথিকান্দা রেলস্টেশনে এসে নামেন। ইশারায় কথা বলা এই নারী নিজের পরিচয় কিংবা ঠিকানা কিছুই বলতে পারছিলেন না। তখন স্টেশনের আশপাশের ব্যবসায়ী ও স্থানীয় মানুষ পরম মমতায় তার নাম দেন ববি বেগম। সেই থেকে মেথিকান্দা রেলস্টেশনই হয়ে ওঠে তার ঠিকানা।
স্টেশনের শৌচাগার ও প্ল্যাটফর্ম পরিষ্কার করে যাত্রীদের দেওয়া সামান্য টাকা জমিয়ে দীর্ঘদিনের কষ্টে তিনি প্রায় ২০ হাজার টাকা সঞ্চয় করেছিলেন। কিন্তু এই সামান্য টাকাই তার জীবনের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল। গত ৪ জুলাই রাতে দুর্বৃত্তরা স্টেশনের একটি কক্ষে ঢুকে তাকে নির্মমভাবে মারধর করে এবং তার বুকের পাঁজরের নিচে লুকিয়ে রাখা জমানো টাকাগুলো লুট করে নেয়। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। কিন্তু ৭ জুলাই শারীরিক অবস্থার আশঙ্কাজনক অবনতি হলে নরসিংদী সদর হাসপাতালে নেওয়ার পথে অ্যাম্বুল্যান্সেই তার মৃত্যু হয়।
ববি বেগমের মৃত্যুর পর পুলিশি তদন্তে বেরিয়ে আসে তার জীবনের আসল রহস্য। জানা যায়, তার প্রকৃত নাম আসলে ওয়াহিদা বেগম। তিনি বগুড়ার গাবতলী উপজেলার নাড়ুয়ামালা ইউনিয়নের শাখাটিয়া গ্রামের বাসিন্দা। ২৫ বছর আগে স্বামী ও একমাত্র মেয়ের অকাল মৃত্যুর পর তীব্র মানসিক ধাক্কা ও পারিবারিক অভিমানে তিনি ঘর ছাড়েন। এরপর দীর্ঘ আড়াই দশক পরিবারের সঙ্গে তার কোনো ধরনের যোগাযোগ ছিল না।
মেথিকান্দা রেলস্টেশনে একজন অজ্ঞাত ও বাকপ্রতিবন্ধী বৃদ্ধার মৃত্যুর খবর গণমাধ্যমে দেখে বগুড়া থেকে তার স্বজনেরা ছুটে আসেন। রোববার দুপুরে বগুড়া থেকে ববি বেগমের দুই বোন ও এক ভাইসহ ১৪ জন স্বজন রায়পুরায় পৌঁছান। সেখানে পৌঁছে তারা অশ্রুসিক্ত নয়নে ববি বেগমের কবর জিয়ারত করেন। পরে তারা মেথিকান্দা রেলস্টেশনে গিয়ে ববি বেগমের থাকার জরাজীর্ণ কক্ষ, তার ব্যবহৃত জিনিসপত্র ও দীর্ঘদিনের কর্মস্থল ঘুরে দেখেন। এ সময় স্টেশনের পরিবেশ এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা করে। স্বজনরা ববি বেগমের খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক ফাঁসির দাবি জানিয়েছেন।
মন্তব্য