খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ই জুন ২০২৬, ৫:১০ পিএম

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে ঘিরে প্রশাসনিক অচলাবস্থা এবার আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। সাবেক বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের কাছে ১৪ পৃষ্ঠার একটি বিস্তারিত চিঠি পাঠিয়ে বর্তমান বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। একই সঙ্গে তিনি বিসিবির জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাটির আর্থিক সহায়তা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখারও অনুরোধ জানিয়েছেন। বিষয়টি প্রকাশ করেছে ক্রিকেটভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ক্রিকবাজ।
ক্রিকবাজ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি সপ্তাহের শুরুতে পাঠানো ওই চিঠিতে আমিনুল ইসলাম দাবি করেন, তাকে বিসিবির সভাপতির পদ থেকে অপসারণ এবং পরবর্তী সময়ে নতুন বোর্ড গঠনের পুরো প্রক্রিয়াটি আইনি ও প্রশাসনিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। তিনি নিজেকে পুনরায় বিসিবির সভাপতি হিসেবে দায়িত্বে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিও উত্থাপন করেছেন। একই সঙ্গে আইসিসিকে অনুরোধ করেছেন, বিষয়টির নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিসিবিকে কোনো ধরনের আর্থিক সহায়তা না দিতে।
বিসিবির একটি সূত্রের বরাত দিয়ে ক্রিকবাজ জানিয়েছে, আইসিসি চিঠিটি পাওয়ার পর এর বিষয়বস্তু বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে অবহিত করে। এরপর বিসিবি নিজেদের আইনজীবী দলের সঙ্গে আলোচনা করে আইসিসির কাছে আনুষ্ঠানিক জবাব পাঠিয়েছে। তবে সেই জবাবে কী ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, তা প্রকাশ করা হয়নি।
এ বিষয়ে আমিনুল ইসলামের সরাসরি বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ক্রিকবাজ জানায়, তার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি এবং পাঠানো বার্তারও কোনো উত্তর দেননি।
বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে কয়েক মাস ধরে চলা প্রশাসনিক টানাপোড়েন। গত ৭ এপ্রিল জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ আমিনুল ইসলাম নেতৃত্বাধীন বোর্ড বিলুপ্ত ঘোষণা করে। বিসিবির আগের নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে গঠিত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে জানানো হয়। একই দিনে সাবেক জাতীয় অধিনায়ক তামিম ইকবালের নেতৃত্বে ১১ সদস্যের একটি অন্তর্বর্তী কমিটি গঠন করা হয়। তাদের ওপর ৯০ দিনের মধ্যে নতুন নির্বাচন আয়োজনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
পরবর্তীতে ৭ জুন বিসিবির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে তামিম ইকবাল বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চার বছরের জন্য বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু আমিনুল ইসলামের দাবি, এই পুরো প্রক্রিয়া যথাযথ আইনগত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত নয় এবং তার অপসারণও নিয়ম অনুযায়ী হয়নি।
এই প্রশাসনিক সংকটের সূত্রপাত আরও আগে। বিসিবি নির্বাচন নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর তদন্তের দাবি জোরালো হয়। তামিম ইকবালের নেতৃত্বে একটি পক্ষ দাবি করেছিল, ঢাকার ৭৬টি ক্লাবের মধ্যে ৫০টি ক্লাব নির্বাচনী অনিয়ম তদন্তের পক্ষে মত দিয়েছে। পরে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ তদন্ত কমিটি গঠন করে এবং সেই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই আমিনুল নেতৃত্বাধীন বোর্ড ভেঙে দেওয়া হয়।
আমিনুল ইসলাম ২০২৫ সালের ৩০ মে বিসিবির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ফারুক আহমেদকে কাউন্সিলর পদ থেকে অপসারণ করে এবং পরবর্তীতে তিনি সভাপতির দায়িত্বও হারান। ফারুক আহমেদ ২০২৪ সালের আগস্টে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করা নাজমুল হাসানের স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন।
আমিনুল ইসলাম সে সময় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলে উন্নয়ন কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বাংলাদেশের ক্রিকেটে একটি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের উদ্দেশ্যে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে নির্বাচন শেষে আবার আইসিসিতে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও পরে তিনি নিজেই নির্বাচনে অংশ নেন এবং অসমাপ্ত সংস্কার কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্বে থাকার ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেন। কিন্তু জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সিদ্ধান্তে সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন হয়নি।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের জন্য আইসিসির আর্থিক সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অর্থ দিয়ে বোর্ডের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নয়ন, বয়সভিত্তিক ক্রিকেট, নারী ক্রিকেট, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, উন্নয়ন প্রকল্প এবং আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনের মতো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাত পরিচালিত হয়। ফলে অর্থায়ন স্থগিতের মতো কোনো সিদ্ধান্ত হলে তার প্রভাব দেশের ক্রিকেটের নানা পর্যায়ে পড়তে পারে।
তবে এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা মন্তব্য প্রকাশ করেনি। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডও বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত সরকারি অবস্থান জানায়নি। ফলে আপাতত পুরো বিষয়টি আইনি ব্যাখ্যা, প্রশাসনিক জবাব এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আনুষ্ঠানিক অবস্থানের অপেক্ষায় রয়েছে।
মন্তব্য