খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ই জুন ২০২৬, ১১:৪৪ পিএম

বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলায় জমিজমা ও দোকানঘর নির্মাণকে কেন্দ্র করে এক তরুণকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। নিহত বাবুর নাম বাবু রাঢ়ী (২৫)। তিনি নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। সামান্য পারিবারিক ও স্থানীয় বিরোধের জের ধরে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডটি ঘটে। আজ বুধবার ভোরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। মর্মান্তিক এই ঘটনার পর মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার সদর ইউনিয়নের সাদেকপুর গ্রামসহ পুরো এলাকায় গভীর শোক ও তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে।
Table of Contents
নিহত বাবু রাঢ়ীর পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, পশ্চিম সাদেকপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে নিজেদের কেনা বা পৈতৃক জমিতে একটি দোকানঘর নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন বাবু। কিন্তু এই দোকান নির্মাণকে কেন্দ্র করে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী পক্ষের সাথে তাঁর দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এই বিরোধের জেরে প্রায় এক মাস আগেও বাবুকে একবার মারধর করা হয়েছিল বলে তাঁর পরিবার দাবি করেছে। তখন বিষয়টি স্থানীয়ভাবে মীমাংসার চেষ্টা করা হলেও প্রতিপক্ষের ক্ষোভ কমেনি।
গতকাল মঙ্গলবার রাত আটটার দিকে এই পুরনো বিরোধের জেরে দুই পক্ষের মধ্যে আবারো কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্বজনদের অভিযোগ, বাগ্বিতণ্ডার একপর্যায়ে স্থানীয় বাসিন্দা বজলু বয়াতী, জাহাঙ্গীর মাল, শহীদ পোদ্দার ও নয়ন পোদ্দারসহ ৮ থেকে ৯ জনের একটি সংঘবদ্ধ দল দেশীয় অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে বাবুর ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। হামলাকারীরা বাবুকে বেধড়ক পিটিয়ে তাঁর মাথা ফাটিয়ে দেয় এবং হাত-পা ভেঙে গুরুতর জখম করে।
মারধরের একপর্যায়ে বাবু অচেতন হয়ে মাটিতে পড়ে থাকলে হামলাকারীরা দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে সটকে পড়ে। প্রতিবেশী এক নারীর মাধ্যমে খবর পেয়ে বাবুর বাবা দুলাল রাঢ়ী তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং ছেলেকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করেন। অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় বাবুকে প্রথমে মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়।
সেখানে তাঁর শারীরিক অবস্থার কোনো উন্নতি না হওয়ায় কর্তব্যরত চিকিৎসক রাত ১০টার দিকে তাঁকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন। বরিশালে পৌঁছানোর পর সেখানেও বাবুর অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকে। এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য রাত ১২টার দিকে চিকিৎসকরা জরুরি ভিত্তিতে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করেন। স্বজনরা জানান, অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছানোর পর ভোর চারটার দিকে কোনো চিকিৎসা শুরু করার আগেই কর্তব্যরত চিকিৎসক বাবুকে মৃত ঘোষণা করেন।
পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে বাবু ছিলেন দ্বিতীয়। এইচএসসি পাস করার পর তিনি পরিবারটিকে টেনে তোলার চেষ্টা করছিলেন। সন্তানকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ বাবা দুলাল রাঢ়ী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার ছেলেকে ৮-৯ জন মিলে নির্মমভাবে পিটিয়েছে। মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে, হাত-পা ভেঙে দিয়েছে। আমার শান্ত ছেলেটা অপরাধীদের হাত থেকে রেহাই পেল না।”
বাবুর চাচা খোরশেদ রাঢ়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “নিজের জমিতে দোকানঘর তুলতে গেলে প্রতিপক্ষ বাধা দেয়। এটি সম্পূর্ণ পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। আমরা এর দ্রুত ও সুষ্ঠু বিচার চাই।” ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ায় তাদের সাথে যোগাযোগ করা বা কোনো বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
নিহত বাবু রাঢ়ীর রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা সভাপতি নীরব ব্যাপারী জানান, বাবু তাঁদের সংগঠনের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন। তবে সংগঠনের ভেতরের কিছু অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও দ্বন্দ্বের কারণে তাঁকে কোনো সুনির্দিষ্ট পদ দেওয়া সম্ভব হয়নি। পুলিশের তদন্তে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে এবং দোষীরা শাস্তি পাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে এই ঘটনার পেছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই বলে দাবি করেছেন মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি গিয়াস উদ্দিন দীপেন। তিনি বলেন, “আমরা যতটুকু জানতে পেরেছি, সম্পূর্ণ পারিবারিক বা স্থানীয় জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটেছে। এর সাথে রাজনীতির কোনো যোগসূত্র নেই। কোনো অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক, তার বিচার হওয়া উচিত।”
মেহেন্দীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মমিন উদ্দিন জানিয়েছেন, ঘটনাটি পুলিশ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখছে। এলাকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ঘটনার সাথে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশি অভিযান শুরু হয়েছে এবং এই বিষয়ে একটি হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
মন্তব্য