নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ এবং আড়াইহাজার উপজেলায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি দলের ওপর আসামিপক্ষ ও উত্তেজিত জনতার হামলার ঘটনা ঘটেছে। একটি মামলার আসামি গ্রেপ্তার অভিযানে গিয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) দক্ষিণ বিভাগের ৩ জন সদস্য মারধরের শিকার হয়েছেন বলে গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। পরে ওই অবরুদ্ধ পুলিশ সদস্যদের অন্য একটি উপজেলায় নিয়ে গিয়ে আবারও মারধর করা হয় বলে থানা পুলিশ নিশ্চিত করেছে। এই ঘটনায় আহত পুলিশ সদস্যদের উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজধানী ঢাকায় প্রেরণ করা হয়েছে।
Table of Contents
ঘটনার সূত্রপাত ও প্রথম দফা হামলা
সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ ও অন্যান্য নির্ভরযোগ্য প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার (১৮ জুন, ২০২৬) বিকেল আনুমানিক ৩টার দিকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) দক্ষিণ বিভাগের ৪ সদস্যের একটি বিশেষ দল নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলার গাউছিয়া এলাকায় গমন করে। তাদের এই সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল একটি চলমান মামলার এজাহারনামীয় আসামিকে গ্রেপ্তার করা। ডিবি পুলিশের দলটি যখন রূপগঞ্জের গাউছিয়া এলাকায় সংশ্লিষ্ট আসামিকে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান পরিচালনা করছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে আসামিপক্ষের লোকজন চারপাশ থেকে অতর্কিতভাবে লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে জড়ো হতে শুরু করে। একপর্যায়ে তারা কর্তব্যরত ডিবি পুলিশের সদস্যদের ওপর সরাসরি হামলা চালায় এবং তাদের অবরুদ্ধ করে মারধর করতে শুরু করে।
অপহরণ ও দ্বিতীয় দফা হামলা
রূপগঞ্জের গাউছিয়া এলাকায় প্রথম দফা হামলার পর পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে। হামলাকারীরা ৩ জন ডিবি পুলিশ সদস্যকে জোরপূর্বক একটি পিকআপ ভ্যানে তুলে নেয়। এরপর সেখান থেকে তাদের অপহরণ করে পার্শ্ববর্তী আড়াইহাজার উপজেলার উচিতপুরা ইউনিয়নের শান্তিনগর বাজারে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, শান্তিনগর বাজারে নিয়ে যাওয়ার পর আসামিপক্ষের লোকজন এবং উত্তেজিত জনতা ওই তিন পুলিশ সদস্যকে দ্বিতীয় দফায় আবারও ব্যাপক মারধর করে। হামলার তীব্রতায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা গুরুতর জখম ও রক্তাক্ত হন।
অভিযানে অংশ নেওয়া অন্য সদস্যের তৎপরতা
এই বিশেষ অভিযানে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের মোট ৪ জন সদস্য অংশ নিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ৩ জন সদস্য সরাসরি হামলার শিকার হলেও অপর একজন সদস্য অক্ষত উপায়ে আত্মরক্ষা করতে সক্ষম হন। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, হামলার শিকার হওয়া তিন কর্মকর্তা ছাড়া অন্য সদস্য তথা কনস্টেবল আকাশ আহমেদ ঘটনার সময় পাশের একটি ওয়াশরুমে (শৌচাগার) অবস্থান করছিলেন। ফলে তিনি আকস্মিক এই হামলার হাত থেকে রক্ষা পান। পরবর্তীতে উদ্ভূত পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তিনি কৌশল অবলম্বন করেন এবং তাদের ব্যবহৃত মাইক্রোবাসটি চালিয়ে দ্রুত আড়াইহাজার থানায় এসে পৌঁছান। থানায় উপস্থিত হয়ে তিনি কর্তব্যরত কর্মকর্তাদের সম্পূর্ণ ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত অবহিত করেন এবং সহকর্মীদের উদ্ধারের অনুরোধ জানান।
পুলিশ সদস্যদের উদ্ধার ও বর্তমান অবস্থা
কনস্টেবল আকাশ আহমেদের কাছ থেকে ঘটনার বিবরণ শোনার পরপরই আড়াইহাজার থানা ও সোনারগাঁ থানা পুলিশের একাধিক দল দ্রুত ঘটনাস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। পুলিশ সদস্যরা উচিতপুরা ইউনিয়নের শান্তিনগর বাজারে পৌঁছে স্থানীয়দের সহায়তায় অবরুদ্ধ এবং গুরুতর আহত তিন ডিবি পুলিশ সদস্যকে উদ্ধার করতে সক্ষম হন।
আহত পুলিশ সদস্যরা হলেন—উপপরিদর্শক (এসআই) মামুন মাতুব্বর, সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আমান উল্লাহ এবং কনস্টেবল কবির আহম্মেদ। উদ্ধারের পর তাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। পুলিশ দ্রুত তাদের উদ্ধার করে আড়াইহাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায় এবং জরুরি বিভাগে ভর্তি করে। চিকিৎসকরা জানান, আহতদের মধ্যে উপপরিদর্শক (এসআই) মামুন মাতুব্বরের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। পরে উন্নত ও জরুরি চিকিৎসার স্বার্থে তাদের আড়াইহাজার থেকে সরাসরি ঢাকায় প্রেরণ করা হয়েছে।
প্রশাসনের বক্তব্য ও আইনি পদক্ষেপের প্রস্তুতি
এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার প্রেক্ষিতে আড়াইহাজার থানায় কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তা জানান, আহত পুলিশ সদস্যদের উদ্ধার করে আড়াইহাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে দ্রুত ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। কারা এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার সাথে জড়িত এবং কেন এই হামলা চালানো হয়েছে, তা উদ্ঘাটন করতে পুলিশ ইতিমধ্যেই গভীর তদন্ত শুরু করেছে। তদন্ত শেষ হলে বিস্তারিত তথ্য পরে গণমাধ্যমকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।
অন্যদিকে, নারায়ণগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) তারেক আল মেহেদী ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, ঢাকা জেলা ডিবির কয়েকজন কর্মকর্তা রূপগঞ্জের ভুলতা ও গাউছিয়া এলাকায় একটি অভিযানে এসেছিলেন। অভিযান পরিচালনার সময় তারা কোনো অফিশিয়াল ইউনিফর্মে ছিলেন না, বরং সাদা পোশাকে ছিলেন। ইউনিফর্ম বা পরিচয়পত্র দৃশ্যমান না থাকায় তারা ভুল বোঝাবুঝির কারণে স্থানীয় জনরোষের শিকার হন। খবর পেয়ে সোনারগাঁ থানা ও আড়াইহাজার থানা পুলিশ যৌথভাবে তাৎক্ষণিক অভিযান চালিয়ে তাদের উদ্ধার করে। প্রাথমিকভাবে তারা আড়াইহাজার থানা পুলিশের নিরাপদ হেফাজতে ছিলেন। এই বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ বর্তমানে ঢাকা জেলা ও ঢাকা মহানগর ডিবি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে সার্বিক যোগাযোগ রক্ষা করছে এবং ঘটনার সাথে জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের প্রস্তুতি চলছে।
