টানা তৃতীয়বারের মতো সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরিধান করার এক বুক স্বপ্ন নিয়ে ফাইনালে মাঠে নেমেছিল বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দল। তবে শেষ পর্যন্ত ভারতের কাছে পরাজিত হয়ে সেই স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেল ঋতুপর্ণা চাকমাদের। ২০২৬ সালের ৬ জুন, শনিবার ভারতের গোয়ার ফতোরদায় অবস্থিত জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে দক্ষিণ এশিয়ার নারীদের ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের এই মহারণ অনুষ্ঠিত হয়। অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই ফাইনালে শক্তিশালী স্বাগতিক ভারতের মুখোমুখি হয়েছিল বাংলাদেশ। ম্যাচের প্রথমার্ধে এক গোলে পিছিয়ে পড়ার পর উইঙ্গার ঋতুপর্ণা চাকমার চমৎকার গোলে সমতায় ফিরেছিল প্রধান কোচ পিটার বাটলারের শিষ্যরা। তবে বিরতির পর দ্বিতীয় অর্ধে রক্ষণভাগের খেই হারিয়ে আরও দুটি গোল হজম করতে হয় বাংলাদেশকে। যার ফলে ম্যাচ শেষে ৩-১ ব্যবধানের পরাজয় নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয় সাবিনা-ঋতুপর্ণাদের। এর আগে, ২০১৬ সালের সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালেও এই শক্তিশালী স্বাগতিক ভারতের কাছেই শিরোপা হারিয়েছিল বাংলাদেশ দল।
ম্যাচের প্রথমার্ধ এবং আক্রমণ-প্রতিআক্রমণের চিত্র
শিরোপা নির্ধারণী এই হাইভোল্টেজ ফাইনালে বাংলাদেশের প্রধান কোচ পিটার বাটলার শুরুর একাদশে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন নিয়ে দল মাঠে নামান। পূর্ববর্তী সেমিফাইনাল ম্যাচে নেপালের বিপক্ষে খেলা একাদশ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল তরুণ স্ট্রাইকার সুরভী আকন্দ প্রীতি এবং উমহেলা মারমাকে। তাদের পরিবর্তে শুরুর একাদশে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল দুই অভিজ্ঞ খেলোয়াড় শামসুন্নাহার জুনিয়র ও ফরোয়ার্ড তহুরা খাতুনকে।
ম্যাচের শুরু থেকেই বাংলাদেশ আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলার চেষ্টা করে এবং ম্যাচের ১২ মিনিটে প্রথম বড় ধরনের সুযোগ তৈরি করে। উইঙ্গার ঋতুপর্ণা চাকমার নিখুঁত একটি ক্রস থেকে বক্সে থাকা তহুরা খাতুন বলের নাগাল পেতে ব্যর্থ হন, ফলে নিশ্চিত একটি সুযোগ হাতছাড়া হয়। এর ঠিক দুই মিনিট পর, অর্থাৎ ম্যাচের ১৪ মিনিটে আবারও ভারতের ডি-বক্সে বল নিয়ে প্রবেশ করেন তহুরা। গোল করার মতো একেবারে ফাঁকা জায়গায় বল পেলেও এই ফরোয়ার্ড গোলপোস্ট লক্ষ্য করে ঠিকঠাক শট নিতে পারেননি। ম্যাচের ৪১ মিনিটে বাংলাদেশের আক্রমণভাগের খেলোয়াড় তহুরার নেওয়া আরও একটি চমৎকার শট অল্পের জন্য ভারতের দূরের পোস্ট ঘেঁষে মাঠের বাইরে চলে যায়।
বাংলাদেশ দল একের পর এক সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করার খেসারত দেয় ম্যাচের ৪২ মিনিটে। পাল্টা আক্রমণ থেকে গোল করে স্বাগতিক ভারতকে এগিয়ে নেন তাদের তারকা ফরোয়ার্ড পেয়ারিজাদা। বাংলাদেশের একজন ডিফেন্ডারকে দারুণভাবে কাটিয়ে বক্সে ঢুকে ডান পায়ের এক জোরালো শটে বাংলাদেশের গোলকিপারের মাথার ওপর দিয়ে বল জালে জড়ান ভারতের এই ১০ নম্বর জার্সিধারী ফুটবলার। ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়েও দমে যায়নি বাংলাদেশ। প্রথমার্ধের খেলা শেষের ঠিক আগ মুহূর্তে স্বাগতিক রক্ষণভাগকে পরাস্ত করে সমতাসূচক গোলটি করেন বাংলাদেশের ঋতুপর্ণা চাকমা। ফলে ১-১ গোলের সমতা নিয়ে দুই দল বিরতিতে যায়।
দ্বিতীয় অর্ধে ভারতের আধিপত্য ও ষষ্ঠ শিরোপা জয়
বিরতির পর ম্যাচের দ্বিতীয় অর্ধে স্বাগতিক ভারত ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেয়। তারা আক্রমণভাগের ধার বাড়িয়ে বাংলাদেশের রক্ষণভাগের ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। বাংলাদেশের মেয়েরা প্রথমার্ধের মতো আক্রমণাত্মক ফুটবল ধরে রাখতে ব্যর্থ হয় এবং রক্ষণভাগের ভুলের কারণে ভারতের আক্রমণ রুখতে হিমশিম খায়।
ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার মাত্র আট মিনিট আগে, অর্থাৎ ৮২ মিনিটে ভারতের আক্রমণভাগের খেলোয়াড় মালাভিকাকে ডান প্রান্তে আটকাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হন বাংলাদেশের রক্ষণভাগের অন্যতম স্তম্ভ আফঈদা খন্দকার। মালাভিকা অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে বল ড্রিবলিং করে বাংলাদেশের বক্সের মাথায় ঠেলে দেন। সেখানে সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকা ভারতের ফুটবলার লিন্দা কম কোনো ভুল না করে অত্যন্ত সহজে বলটি বাংলাদেশের জালে পাঠিয়ে দেন। এই গোলের মাধ্যমে ভারত ম্যাচে ৩-১ ব্যবধানে স্পষ্ট লিড নিয়ে নিজেদের জয় নিশ্চিত করে।
এই জয়ের ফলে দীর্ঘ ছয় বছরের শিরোপা খরা কাটিয়ে আবারও দক্ষিণ এশিয়ার নারী ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্ব পুনরুদ্ধার করল ভারত। সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের ইতিহাসে এটি ভারতের ষষ্ঠ ট্রফি জয়। অন্যদিকে, টানা দুই আসরে চ্যাম্পিয়ন হওয়া বাংলাদেশ দলকে এবার রানার্স-আপ ট্রফি নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হলো।
