কিডনি প্রতিস্থাপনের আশায় চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ভারতে গিয়েছিল একটি বাংলাদেশি পরিবার। কিন্তু সেই যাত্রাই শেষ পর্যন্ত রূপ নেয় হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডিতে। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার সাঙ্গীশ্বর গ্রামের বাসিন্দা নুরুল আমিনের মৃত্যু হয়েছে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লার একটি হোটেলে সংঘটিত ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হওয়ার পর। একই ঘটনায় তাঁর পরিবারের আরও চার সদস্য গুরুতর আহত হয়ে বর্তমানে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
নিহত নুরুল আমিন (৪৪) ছিলেন একজন ব্যবসায়ী এবং তিন সন্তানের জনক। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর ভগ্নিপতি মোশারফ হোসেন দীর্ঘদিন ধরে জটিল কিডনি রোগে ভুগছিলেন। চিকিৎসকদের পরামর্শে কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গত ২ জুন তিনি ঢাকা থেকে দিল্লি যান। চিকিৎসা-সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পাশাপাশি অস্ত্রোপচারের প্রস্তুতিও চলছিল।
পরিবারটি দক্ষিণ দিল্লির মালভিয়া নগর এলাকার একটি আবাসিক হোটেলে অবস্থান করছিল। সেখানে সম্ভাব্য কিডনি দাতা হিসেবে ছিলেন নুরুল আমিনের চাচাতো বোন উম্মে জোহরা। চিকিৎসা প্রক্রিয়ার বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার অপেক্ষায় ছিল পরিবারটি। কিন্তু হঠাৎ ঘটে যায় ভয়াবহ দুর্ঘটনা।
স্বজনদের বর্ণনা অনুযায়ী, বুধবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে হোটেল ভবনে আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ভবনের বিভিন্ন তলায় ছড়িয়ে পড়ে এবং আতঙ্কে ছুটোছুটি শুরু হয় অতিথিদের মধ্যে। ঘটনার সময় নুরুল আমিন নিচতলার রেস্তোরাঁয় নাশতা করছিলেন, আর পরিবারের অন্য সদস্যরা নিজ নিজ কক্ষে অবস্থান করছিলেন।
আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় অনেকে নিরাপদে বের হওয়ার সুযোগ পাননি। উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে দগ্ধ অবস্থায় নুরুল আমিনসহ পাঁচজন বাংলাদেশিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। তবে গুরুতর দগ্ধ নুরুল আমিনকে শেষ পর্যন্ত বাঁচানো সম্ভব হয়নি। বৃহস্পতিবার চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
হতাহত বাংলাদেশিদের অবস্থা
| নাম | পরিচয় | বর্তমান অবস্থা |
|---|---|---|
| নুরুল আমিন | রোগীর স্বজন ও ব্যবসায়ী | নিহত |
| মোশারফ হোসেন | কিডনি রোগী | আইসিইউতে চিকিৎসাধীন |
| রেহানা আক্তার | নুরুল আমিনের বড় বোন | আইসিইউতে চিকিৎসাধীন |
| উম্মে জোহরা | চাচাতো বোন ও সম্ভাব্য কিডনি দাতা | আইসিইউতে চিকিৎসাধীন |
| উম্মে জাইমা | উম্মে জোহরার মেয়ে | আইসিইউতে চিকিৎসাধীন |
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, নুরুল আমিন চট্টগ্রামভিত্তিক একটি খাদ্যপণ্য উৎপাদন প্রতিষ্ঠানের মালিক ছিলেন। তাঁর মৃত্যুসংবাদ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছানোর পর পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও স্থানীয় বাসিন্দারা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। অনেকেই তাঁর মানবিক ও সহযোগিতাপরায়ণ স্বভাবের কথা স্মরণ করছেন।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের সহায়তায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। চৌদ্দগ্রাম উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কূটনৈতিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আহতদের চিকিৎসার অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, নয়াদিল্লায় বাংলাদেশ হাইকমিশনও বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। নিহতের মরদেহ দেশে পাঠানো এবং আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় অব্যাহত রয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মালভিয়া নগরের ওই বহুতল ভবনের নিচতলায় একটি রেস্তোরাঁ এবং ওপরের তলাগুলোতে আবাসিক হোটেল পরিচালিত হতো। ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডে বিভিন্ন দেশের অন্তত ২২ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ২৮ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ভারত, বাংলাদেশ, মোজাম্বিক, লাইবেরিয়া, নাইজেরিয়া ও উজবেকিস্তানের নাগরিক রয়েছেন। ফলে ঘটনাটি শুধু একটি স্থানীয় দুর্ঘটনা নয়, বরং আন্তর্জাতিক মাত্রা পাওয়া একটি মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বহুতল ভবনে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি থাকলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যায়। এ কারণে তদন্তকারীরা ভবনটির অগ্নিনিরাপত্তা সরঞ্জামের কার্যকারিতা, জরুরি নির্গমনপথের অবস্থা, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপত্তা বিধি মেনে চলার বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছেন। তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর আগুন লাগার প্রকৃত কারণ এবং কোনো ধরনের অবহেলা ছিল কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
চিকিৎসার আশায় বিদেশে যাওয়া একটি পরিবারের জন্য এই ঘটনা যে অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে এনেছে, তা শুধু স্বজনদের নয়, পুরো এলাকার মানুষের হৃদয়কেও গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। পরিবারের সদস্যরা এখন আহতদের সুস্থতা এবং নিহত নুরুল আমিনের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার অপেক্ষায় রয়েছেন।
