জনগণের ওপর একটি অকার্যকর এবং সরকারনিয়ন্ত্রিত মানবাধিকার কমিশন চাপিয়ে দেওয়া হলে তা শেষ পর্যন্ত সরকারের জন্যই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তাঁর মতে, এ ধরনের স্বাধীন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করতে যারা ব্যর্থ হয়, তারা আসলে নিজেদের অজান্তেই এক ধরনের ‘ফ্র্যাঙ্কস্টাইন’ তৈরি করে। কারণ, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কখনোই চিরস্থায়ী বিষয় নয়। আজ যে প্রতিষ্ঠানকে দলীয় স্বার্থে প্রভাবিত ও অকার্যকর করা হবে, ভবিষ্যতে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর সেই অকার্যকরতার নেতিবাচক ভুক্তভোগী কিন্তু আজকের নীতিনির্ধারকেরাই হবেন।
রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে আয়োজিত এক অধিপরামর্শ সভায় তিনি এই মন্তব্য করেন। ‘খসড়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০২৬: হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ (এইচআরএফবি) ও টিআইবির পর্যালোচনা ও সুপারিশ’ শীর্ষক এই যৌথ সভার আয়োজন করা হয়।
সভায় খসড়া আইনটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করে মোট ১৯টি সুনির্দিষ্ট সংস্কার প্রস্তাব ও সুপারিশ তুলে ধরা হয়। ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে দেওয়া এই প্রস্তাবগুলো যদি আইনে অন্তর্ভুক্ত করা না হয়, তবে এটিই প্রমাণিত হবে যে দেশে একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী মানবাধিকার কমিশন গঠনে সরকারের কোনো সদিচ্ছা নেই। একই সঙ্গে তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি যে ৩১ দফা রাষ্ট্রসংস্কার কর্মসূচি, নির্বাচনী ইশতেহার এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে, তা যদি তারা সততার সঙ্গে পালন করে, তবে সরকারের নিয়ন্ত্রণমুক্ত একটি প্রকৃত স্বাধীন কমিশন গঠন করা অবশ্যই সম্ভব।
মুক্ত আলোচনায় এক প্রশ্নের জবাবে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি অন্ধকার দিক উন্মোচন করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে যারা যখনই ক্ষমতায় আসেন বা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী দায়িত্বে থাকেন, তারা প্রত্যেকেই সাময়িক ও ক্ষণস্থায়ী রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়ার লোভ সামলাতে পারেন না। আর এই ক্ষণস্থায়ী সুবিধার জন্য তারা বছরের পর বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে সুপরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করেছেন। বিশ্বের অনেক দেশে অনেক বেশি কর্তৃত্ববাদী ও স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা থাকলেও, জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে এভাবে নগ্নভাবে দলীয়করণ ও পুরোপুরি অকার্যকর করার নজির খুব কম দেশেই আছে। এখন সময় এসেছে এই নোংরা সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন করার।
প্রস্তাবিত আইনের খসড়া বিশ্লেষণে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার বিষয়টিও সভায় উঠে আসে। সরকারের ভেতরে এখনও একটি ‘পরিবর্তনবিরোধী শক্তি’ বা প্রতিরোধ তৈরি করার দল সক্রিয় বলে সবাইকে সতর্ক করেন ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, এই প্রতিরোধশক্তি কেবল রাজনৈতিকই নয়; অনেক ক্ষেত্রে রাজনীতিকদের চেয়েও বেশি প্রভাবশালী ও বাধা হয়ে দাঁড়ায় আমলাতন্ত্র। আর এই আমলাতান্ত্রিক রক্ষণশীল মানসিকতার স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা গেছে বর্তমান মানবাধিকার কমিশন আইনের খসড়াতেও, যা স্বাধীন কমিশন গঠনে একটি বড় অন্তরায়।









