টাঙ্গাইলের গোপালপুর ও ভূঞাপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী দুই গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে এক মারাত্মক ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। প্রায় টানা চার ঘণ্টাব্যাপী চলা এই তুমুল সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন ব্যক্তি গুরুতর আহত হয়েছেন এবং একজন ব্যক্তি নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। সংঘর্ষ চলাকালে ব্যাপক সহিংসতায় ১১টি আবাসিক বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করার পাশাপাশি অন্তত অর্ধশতাধিক ব্যবসায়ী দোকানপাটে ভাঙচুর ও ব্যাপক লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। ২০২৬ সালের ৪ জুন (বৃহস্পতিবার) বিকেল থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত এই সংঘাতের পরিস্থিতি বজায় থাকে।
সংঘর্ষের প্রেক্ষাপট ও ঘটনার সূত্রপাত
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, প্রায় এক মাস পূর্বে একটি দোকানে বাকিতে পণ্য ক্রয়-বিক্রয় এবং বকেয়া টাকা পরিশোধ নিয়ে সৃষ্ট বিরোধের জের ধরে এই ভয়াবহ সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটে। গোপালপুর উপজেলার হেমনগর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শামছুল আলম এই ঘটনার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জানান, প্রায় এক মাস আগে গোপালপুর উপজেলার গুলিপেচা গ্রাম এবং ভূঞাপুর উপজেলার অর্জুনা ইউনিয়নের জগৎকুড়া গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দার মধ্যে বকেয়া টাকা নিয়ে প্রথম বিরোধ তৈরি হয়। ওই প্রাথমিক সংঘর্ষের ঘটনায় উভয় পক্ষের ১০ থেকে ১২ জন ব্যক্তি আহত হয়েছিলেন। আহতদের মধ্যে অর্জুনা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি নিয়ামত আলী খানও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শামছুল আলম আরও জানান, ওই পূর্ববর্তী ঘটনার পর জগৎকুড়া গ্রামের লোকজন গুলিপেচা গ্রামে প্রবেশ করে অতর্কিত হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। এরই ধারাবাহিকতায় ও জের ধরে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর জগৎকুড়া গ্রামের কয়েকশত মানুষ সমবেত হয়ে লাঠিসোঁটা, দেশীয় অস্ত্র ও রামদা নিয়ে পুনরায় গুলিপেচা গ্রামে সঙ্ঘবদ্ধ হামলা চালায়।
অগ্নিসংযোগ, লুটপাট এবং হতাহতের বিবরণ
গুলিপেচা গ্রামে হামলা চলাকালীন আক্রমণকারীরা স্থানীয় বাসিন্দাদের ১১টি আবাসিক বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে বাড়িগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর পাশাপাশি হামলাকারীরা বসতবাড়ি থেকে গৃহপালিত গরু-বাছুরসহ বিভিন্ন মূল্যবান মালামাল ও আসবাবপত্র লুট করে নিয়ে যায়। এই আকস্মিক হামলায় আত্মরক্ষার্থে গিয়ে নারী ও শিশুসহ গ্রামের বেশ কয়েকজন অধিবাসী আহত হন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আহতদের মধ্যে হেমনগর ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসেনের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত গুরুতর ও আশঙ্কাজনক।
অন্য দিকে, ভূঞাপুরের জগৎকুড়া গ্রামের বাসিন্দা এবং নলিন বাজারের ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম পাল্টা অভিযোগ উত্থাপন করে জানান, রাত ৮টার পর হেমনগর ইউনিয়নের শাখারিয়া গ্রামের কয়েকশত মানুষ দলবদ্ধ হয়ে স্থানীয় নলিন বাজারে অতর্কিত হামলা চালায়। তারা বাজারে বেছে বেছে নির্দিষ্টভাবে জগৎকুড়া গ্রামের ব্যবসায়ীদের মালিকানাধীন দোকানপাটে ভাঙচুর ও মালামাল লুটপাট করতে শুরু করে। ব্যবসায়ী নজরুল ইসলামের দাবি অনুযায়ী, এই বাজারে প্রায় অর্ধশতাধিক দোকানে ভাঙচুর ও লুটপাটের কারণে ব্যবসায়ীদের আনুমানিক তিন কোটি টাকার মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত এবং সম্পূর্ণ লুট হয়ে গেছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বর্তমান অবস্থা ও পুলিশের বক্তব্য
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাত ৯টা পর্যন্ত উভয় পক্ষের বিপুল সংখ্যক মানুষ নতুন করে পাল্টা হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, যার ফলে সমগ্র এলাকায় চরম উত্তেজনা ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং নতুন কোনো সহিংসতা এড়াতে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে ঘটনাস্থলে বিপুল সংখ্যক অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোবায়েন করা হয়েছে।
গোপালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনোয়ার হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, সংঘর্ষের ঘটনায় একজন পুরুষ ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। তবে নিহত ব্যক্তির নাম, পরিচয় বা রাজনৈতিক অবস্থান তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তিনি আরও জানান, পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ বাহিনী নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পদক্ষেপ সম্পর্কে ভূঞাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাব্বির রহমান ঘটনার ভয়াবহতা নিশ্চিত করে জানান, দুই পক্ষের মধ্যকার এই তীব্র সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে দায়িত্ব পালনকালে পুলিশের পাঁচজন সদস্য ইটের আঘাত ও হামলায় আহত হয়েছেন। বর্তমানে অতিরিক্ত পুলিশ ফোর্স ঘটনাস্থলে অবস্থান নিয়ে পরিস্থিতি শান্ত রাখার চেষ্টা করছে। এর পাশাপাশি খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে বসতবাড়িতে লাগা আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমানে পরিস্থিতি থমথমে থাকলেও পুলিশি টহল জোরদার রয়েছে।
