লেবাননের ঐতিহাসিক বিউফোর্ট দুর্গ দখল করল ইসরায়েল

লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে পাহাড়চূড়ায় অবস্থিত মধ্যযুগীয় ঐতিহাসিক বিউফোর্ট দুর্গটি দখল করে নিয়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের চলমান তীব্র সামরিক অভিযানের অংশ হিসেবে এই প্রাচীন দুর্গটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় তারা। ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে যুদ্ধবিরতি সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আলোচনা চলমান থাকার মাঝেই ২০২৬ সালের মে মাসের শেষ রবিবারে ইসরায়েলি বাহিনীর পক্ষ থেকে এই দুর্গটি দখলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়।

ঐতিহাসিক এই দুর্গটি দখলের পর ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ ১৯৮২ সালের লেবানন যুদ্ধে নিহত সেনাদের স্মরণে আয়োজিত একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে যোগ দেন। সেখানে তিনি বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেন, ইসরায়েলের উত্তরে অবস্থিত ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক পাহাড়ি এলাকা গ্যালিলির জনপদগুলোর ওপর নজর রাখার জন্য ব্যবহৃত পাহাড়চূড়াগুলোতে আবারও ইসরায়েলের জাতীয় পতাকা উড়ছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টাইমস অব ইসরায়েল’-এর প্রতিবেদনে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এই বক্তব্যটি স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুর্গের একটি ছবিও প্রকাশ করেন, যেখানে ইসরায়েলের জাতীয় পতাকার পাশাপাশি দেশটির সেনাবাহিনীর সম্মুখসারির পদাতিক বাহিনী হিসেবে পরিচিত গোলানি ব্রিগেডের পতাকাও দেখা যায়।

বিউফোর্ট দুর্গের ঐতিহাসিক পরিচিতি ও ভৌগোলিক অবস্থান

বিউফোর্ট দুর্গটি স্থানীয়ভাবে এবং আরবি ভাষায় ‘কালাত আল-শাকিফ’ নামে পরিচিত। প্রায় ৯০০ বছরের পুরোনো এই প্রাচীন দুর্গটি লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৭০০ মিটার বা ২ হাজার ৩০০ ফুট উঁচুতে একটি পাথুরে পাহাড়চূড়ায় অবস্থিত। ১২ শতকে মধ্যযুগে ইউরোপের খ্রিষ্টান অধ্যুষিত রাজ্যগুলো থেকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে পরিচালিত ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধে অংশ নেওয়া যোদ্ধারা অর্থাৎ ক্রুসেডাররা এই দুর্গটি নির্মাণ করেছিল। প্রাচীন ফরাসি ভাষায় ‘বিউফোর্ট’ শব্দের অর্থ হলো ‘সুন্দর দুর্গ’। এখান থেকে লেবাননের কৌশলগত লিতানি নদীর ওপর সরাসরি নজর রাখা যায়।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই দুর্গের নিয়ন্ত্রণ বহুবার হাতবদল হয়েছে। ক্রুসেডার শাসকদের হাত থেকে এর নিয়ন্ত্রণ পরবর্তীতে বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তির কাছে হস্তান্তরিত হয়, যার মধ্যে দীর্ঘ সময় অটোমান সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণও ছিল। ঐতিহাসিকভাবে দুর্গটির এই উঁচু অবস্থানের কারণে এটি সমগ্র অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও প্রতিরক্ষা ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফিলিস্তিনি যোদ্ধারা এই স্থানটিকে একটি প্রধান সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। এরপর ১৯৮২ সালে লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসনের সময় এটি ইসরায়েল দখল করে নেয় এবং দীর্ঘ সময় পর ২০০০ সালে ওই এলাকা থেকে ইসরায়েলি সেনাদের প্রত্যাহার করা হয়। বর্তমানে ২০২৬ সালের ৩১ মে রয়টার্সের প্রকাশিত ছবিতে পুনরায় ইসরায়েলি সেনাদের এই দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অভিযান চালাতে দেখা যায়।

বিউফোর্ট দুর্গের সামরিক ও কৌশলগত গুরুত্ব

বিউফোর্ট দুর্গটি লেবাননের পঞ্চম বৃহত্তম শহর নাবাতিয়েহর কাছে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পাহাড়চূড়ায় অবস্থিত। ইসরায়েলি বাহিনী শুধু এই দুর্গই নয়, বরং এর আশপাশের সবকটি পাহাড়ি চূড়ার নিয়ন্ত্রণও নিজেদের হাতে নিয়েছে। দুর্গটি দখল করার কারণে ইসরায়েলি সেনারা দক্ষিণ লেবানন ও উত্তর ইসরায়েলের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারির একটি বিশাল পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র লাভ করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার আঞ্চলিক সাংবাদিক ওবাইদা হিত্তো জানান, এই দুর্গটি দখলের ফলে ইসরায়েলি বাহিনী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য কৌশলগত সুবিধা পেয়েছে।

পর্যবেক্ষণযোগ্য প্রধান অঞ্চলসমূহসামরিক ও ভৌগোলিক গুরুত্বের বিবরণ
নাবাতিয়েহ শহর ও আশপাশের গ্রামশহরের চারপাশের সবকটি বেসামরিক ও সামরিক যাতায়াত ব্যবস্থার ওপর নজরদারি করা যায়।
পশ্চিম বেকা উপত্যকালেবাননের অভ্যন্তরে হিজবুল্লাহর চলাচলের অন্যতম প্রধান পথ পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব।
অধিকৃত গোলান মালভূমিআন্তর্জাতিকভাবে বিতর্কিত এই মালভূমির সীমান্ত সুরক্ষায় সুবিধা পাওয়া যায়।
উত্তর গ্যালিলি অঞ্চলইসরায়েলের নিজস্ব উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্ত জনপদগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।

দক্ষিণ লেবাননের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি ও ক্ষয়ক্ষতি

২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা শুরু করার পর থেকে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের এক বিশাল অংশ ইসরায়েল দখল করে নেয়। বর্তমানে দেশটি লেবাননের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অর্থাৎ প্রায় ২千 বর্গকিলোমিটার এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ২০২৬ সালের ২ মার্চ ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলীয় হাইফা এলাকার কাছে একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা স্থাপনায় রকেট ও চালকহীন বিমান বা ড্রোন হামলা চালানোর মাধ্যমে এই সাম্প্রতিকতম যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এর আগে ২০২৪ সালের নভেম্বরের যুদ্ধবিরতির পর থেকে তারা ইসরায়েলে কোনো হামলা করেনি।

লেবাননের জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, গত ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি হামলায় লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে এ পর্যন্ত ৩ হাজার ৪১২ জন নিহত এবং ১০ হাজার ২৬৯ জন আহত হয়েছেন। শুধু গত রবিবারে এক দিনেই অঞ্চলটিতে ৩৬টির বেশি বিমান ও স্থল হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং ৩৫ জন আহত হয়েছেন।

সম্প্রতি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু লেবাননের আরও অভ্যন্তরে ঢুকে সামরিক অভিযান জোরালো করার নির্দেশ দিয়েছেন। এর ফলে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর আরবি ভাষার মুখপাত্র আভিচাই আদ্রাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি জরুরি ঘোষণা জারি করেন। এই আদেশে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের সাতটি গ্রাম—হুমাইন আল-ফাওকা, বনাফৌল, আরব সালিম, রুমিন, আজজি, আরকি ও জাবার বাসিন্দাদের অবিলম্বে নিজ বাড়িঘর ছেড়ে অন্তত এক হাজার মিটার দূরে সরে যাওয়ার জন্য জোরপূর্বক নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।