খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ই জুন ২০২৬, ৩:৪৯ পিএম

পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে চলা জোরপূর্বক গুমের এক বিভীষিকাময় বাস্তবতার চিত্র আবারও সামনে এসেছে। ১৭ বছর আগে নিখোঁজ হওয়া চিকিৎসক ডা. দীন মোহাম্মদ বালোচের স্মরণে তাঁর কন্যা তথা বিশিষ্ট বেলুচ মানবাধিকারকর্মী সাম্মি দীন বালোচ একটি আবেগঘন খোলা চিঠি প্রকাশ করেছেন। বাবার নিখোঁজের ১৭তম বার্ষিকীতে লেখা এই চিঠিটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করেছে। চিঠিতে সাম্মি পাকিস্তানি রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে তাঁর বাবার নিরাপদ প্রত্যাবর্তন, আর সেটি সম্ভব না হলে অন্তত তাঁর মৃত্যুর একটি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দাবি করেছেন।
সাম্মি তাঁর চিঠিতে তীব্র ক্ষোভ ও আকুতি মিশিয়ে লিখেছেন, “হয়তো এ বছর আপনারা তাঁকে বাড়ি ফিরতে দেবেন। আর যদি আপনারা তাঁকে মেরেই ফেলে থাকেন, তবে অন্তত এ বছর আমাদের আর কোনো আদালতের শুনানির তারিখ দেবেন না। আমাদের একটি মৃত্যুসনদ দিন, যাতে আমরা এই অন্তহীন অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি পাই।”
ঘটনার সূত্রপাত ২০০৯ সালের ২৮ জুন। পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশের খুজদার জেলার একটি সরকারি হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন ডা. দীন মোহাম্মদ বালোচ। ওই দিন রাতে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা তাঁকে তুলে নিয়ে যায় বলে তাঁর পরিবার এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন শুরু থেকেই দাবি করে আসছে। সেই রাতের পর থেকে আজ পর্যন্ত তাঁর আর কোনো খোঁজ মেলেনি।
স্থানীয় সূত্র ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দীর্ঘদিনের অভিযোগ, পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং তাদের শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI) বেলুচিস্তানে বছরের পর বছর ধরে ভিন্নমত দমনে এই ‘জোরপূর্বক গুম’ (Enforced Disappeared) কৌশল ব্যবহার করছে। তবে পাকিস্তান সরকার ও দেশটির সামরিক বাহিনী বরাবরই এই সুনির্দিষ্ট অভিযোগগুলো অস্বীকার করে আসছে। তাদের দাবি, নিখোঁজ ব্যক্তিদের অনেকেই হয়তো সীমান্ত পার হয়ে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীতে যোগ দিয়েছেন।
নিজের শৈশব ও কৈশোরের যন্ত্রণার কথা স্মরণ করে সাম্মি দীন বালোচ লিখেছেন, “রাষ্ট্র আমাকে উপহার দিয়েছে শুধু গুম, অস্বীকার আর চরম অপমান। আমার বাবাকে কেড়ে নেওয়ার পর তাঁকে ভালোবাসার শাস্তি হিসেবে এই নরকযন্ত্রণা আমাকে প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে বহন করতে হচ্ছে।”
বাবার নিখোঁজের পর সাম্মি ঘরে বসে থাকেননি। বর্তমানে তিনি ‘ভয়েস ফর বেলুচ মিসিং পারসন্স’ (VBMP) নামক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। গত এক দশকে তিনি বেলুচিস্তানের হাজারো নিখোঁজ মানুষের পরিবারের প্রধান ভরসাস্থল হয়ে উঠেছেন। গুমের শিকার পরিবারগুলোকে আইনি সহায়তা দেওয়া, রাজধানী ইসলামাবাদসহ বিভিন্ন বড় শহরে লং মার্চ ও দীর্ঘস্থায়ী প্রতিবাদ কর্মসূচির নেতৃত্ব দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ফোরামে বেলুচদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরার ক্ষেত্রে তিনি অন্যতম প্রধান মুখ।
এই দীর্ঘ লড়াইয়ে সাম্মিকে পদে পদে চরম বাধার মুখোমুখি হতে হয়েছে। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে তিনি একাধিকবার গ্রেফতার হয়েছেন, তাঁর ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হয়েছে এবং নানাভাবে হুমকি ও হয়রানি করা হয়েছে। তবে কোনো প্রতিকূলতাই তাঁকে তাঁর পথ থেকে সরাতে পারেনি।
এদিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ‘ফ্রন্ট লাইন ডিফেন্ডার্স’ সাম্মির এই লড়াইয়ের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি পাকিস্তান কর্তৃপক্ষের কাছে অবিলম্বে ডা. দীন মোহাম্মদ বালোচের বর্তমান অবস্থান ও অবস্থা প্রকাশ করার দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে বেলুচিস্তানে ঘটে যাওয়া সমস্ত গুমের ঘটনার একটি নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানের তদন্ত নিশ্চিত করার জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে তারা।
চিঠির শেষাংশে সাম্মি লিখেছেন, “আমার আব্বা কোনো কাগুজে ফাইল ছিলেন না, তিনি কোনো উড়ো গুজবও নন। তিনি ছিলেন ডা. দীন মোহাম্মদ—একজন রক্তমাংসের মানুষ, একজন সেবাব্রতী চিকিৎসক, একজন স্বামী এবং একজন স্নেহময় বাবা। রাষ্ট্র তাঁকে তুলে নিয়ে যাওয়ার আগে তিনি শুধুই আমাদের ছিলেন।”
মন্তব্য