ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) দুটি স্থানীয় পক্ষের মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধের জেরে সংঘটিত এই সংঘর্ষের সময় উভয় পক্ষের মধ্যে ব্যাপক ইটপাটকেল নিক্ষেপ, লাঠিসোটা নিয়ে আক্রমণ এবং হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এতে দুই পক্ষের অন্তত আটজন নেতাকর্মী ও সমর্থক গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন। শুক্রবার (২৯ মে) রাত আনুমানিক ৮টার দিকে শৈলকুপা উপজেলার শেখড়া বাজারে এই সহিংস সংঘর্ষের ঘটনাটি ঘটে। এই ঘটনার পর থেকে পুরো এলাকায় তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে।
পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, শৈলকুপা উপজেলার নিত্যানন্দপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি গোলাম মোস্তফা এবং একই ইউনিয়ন বিএনপির উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য আব্দুস সালামের মধ্যে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র বিরোধ ও মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব চলে আসছিল। এই দুই নেতার অনুসারীদের মধ্যে এর আগেও একাধিকবার ছোটখাটো উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায়, শুক্রবার রাত ৮টার দিকে শেখড়া বাজারে উভয় পক্ষের সমর্থক ও কর্মীরা মুখোমুখি হলে প্রথমে তাঁদের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা ও মৌখিক তর্কাতর্কির সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে সেই সাধারণ বিতর্ক রূপ নেয় শারীরিক হাতাহাতিতে। মুহূর্তের মধ্যে উভয় পক্ষের অন্যান্য সমর্থকেরা লাঠিসোটা ও দেশীয় অস্ত্রশস্র নিয়ে বাজারে জড়ো হয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হন। সংঘর্ষ চলাকালীন পুরো বাজার এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ করে দেন। দুই পক্ষই একে অপরকে লক্ষ্য করে অনবরত ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে, যার ফলে উভয় পক্ষের অন্তত আটজন আহত হন।
আহতদের পরিচয় ও চিকিৎসার বিবরণ
সংঘর্ষের এই ঘটনায় আহতদের মধ্যে পাঁচজনের সুনির্দিষ্ট পরিচয় নিশ্চিত করা গেছে। আহত এই ব্যক্তিরা হলেন—মো. শহীদ বিশ্বাস (৪২), দানেফ (৪৫), শাহিন বিশ্বাস (৪০), বাবুল বিশ্বাস (৪২) এবং এনামুল বিশ্বাস (২৮)। এই ঘটনায় আহত হওয়া অন্য তিনজনের নাম ও পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে বিশদভাবে জানা সম্ভব হয়নি।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ও পুলিশের বর্তমান ভূমিকা
পুলিশি অভিযান ও সর্বশেষ পরিস্থিতি:
তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া: শেখড়া বাজারে বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে এই সংঘর্ষের খবর পাওয়ার পরপরই শৈলকুপা থানা পুলিশ এবং নিকটবর্তী স্থানীয় পুলিশ ক্যাম্পের যৌথ ফোর্স অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ঘটনাস্থলে রওনা হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ: শৈলকুপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হুমায়ুন কবির মোল্লা ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে গণমাধ্যমকে জানান, ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই শৈলকুপা থানা পুলিশ ও স্থানীয় পুলিশ ক্যাম্পের একটি শক্তিশালী দল শেখড়া বাজারে পৌঁছায়। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাঠিচার্জ ও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পুলিশের সময়োচিত হস্তক্ষেপের কারণে দুই পক্ষই বাজার এলাকা থেকে পিছু হটে যায়।
চিকিৎসা ও সুনির্দিষ্ট তথ্য: আহতদের মধ্যে মো. শহীদ বিশ্বাসের (৪২) শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক ও গুরুতর হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁকে দ্রুত উদ্ধার করে শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করেন। বর্তমানে তিনি সেখানে চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। অন্যদিকে, সংঘর্ষে আহত অন্য ব্যক্তিরা স্থানীয় বিভিন্ন প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও ক্লিনিকে গিয়ে তাঁদের প্রাথমিক চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন। আইনগত জটিলতা এড়াতে অনেকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও তদন্তের সর্বশেষ অবস্থা
ওসি হুমায়ুন কবির মোল্লা আরও উল্লেখ করেন যে, পুলিশের তৎপরতায় বর্তমানে ওই এলাকার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ শান্ত ও স্বাভাবিক রয়েছে। তবে নতুন করে যেন কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা বা পুনরায় সংঘর্ষের সৃষ্টি না হতে পারে, সেজন্য শেখড়া বাজার এবং এর আশেপাশের কৌশলগত পয়েন্টগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
পুলিশি টহল জোরদার করার পাশাপাশি এই সহিংসতার ঘটনায় জড়িতদের সনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। তবে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো পক্ষের পক্ষ থেকেই থানায় কোনো আনুষ্ঠানিক লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়নি এবং পুলিশ কাউকে আটক বা গ্রেফতার করতে পারেনি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশি নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।
