ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কার ‘ব্যালন ডি’অর’ তার দীর্ঘ ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে চলেছে। ১৯৫৬ সালে ফরাসি ফুটবল সাময়িকী ‘ফ্রান্স ফুটবল’-এর উদ্যোগে এই পুরস্কারের যাত্রা শুরু হয়েছিল। তৎকালীন সময়ে ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি ফুটবলার স্যার স্ট্যানলি ম্যাথিউস ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে এই মর্যাদাপূর্ণ ট্রফিটি নিজের করে নিয়েছিলেন। সেই ঐতিহাসিক ঘটনার পর থেকে দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে পুরস্কার প্রদানের মূল অনুষ্ঠানটি ঐতিহ্যগতভাবে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসেই আয়োজিত হয়ে আসছে। তবে আগামী ২৬ অক্টোবর ব্যালন ডি’অর জয়ের ৭০ বছর পূর্তি বা ৭০তম আসর উপলক্ষে এই নিয়মে এক বড় ব্যতিক্রম নিয়ে আসার বিশেষ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন এর আয়োজকেরা।
ব্যালন ডি’অরের দীর্ঘ ইতিহাসে এর আগে যা কখনো ঘটেনি, এবার ঠিক তেমনই এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। ফ্রান্সের চিরচেনা সীমানা পেরিয়ে এবারের জমকালো পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে। প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এই আয়োজনটি সাধারণত ফরাসি সাময়িকী ‘ফ্রান্স ফুটবল’-এর মূল মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ‘গ্রুপ লেকিপ’ (Groupe Amaury/L’Équipe)-এর সার্বিক তত্ত্বাবধানে ও পরিচালনায় প্যারিসের কোনো ঐতিহ্যবাহী ভেন্যুতে সম্পন্ন হতো। তবে ৭০ বছর পূর্তির বিশেষ মাইলফলককে স্মরণীয় করে রাখতে এবার প্যারিসের বাইরে লন্ডনে অনুষ্ঠান আয়োজনের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও, নিরাপত্তার স্বার্থে বা কৌশলগত কারণে এখনো পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো ভেন্যু বা প্রেক্ষাগৃহের নাম প্রকাশ করেনি আয়োজক কর্তৃপক্ষ।
মেসি-রোনালদোর দীর্ঘ আধিপত্য এবং সাম্প্রতিক পালাবদল
বিগত দুই দশক ধরে বিশ্ব ফুটবলে ব্যালন ডি’অর পুরস্কারটি মূলত লিওনেল মেসি এবং ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মধ্যকার তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও একচেটিয়া আধিপত্যের কারণে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছিল। এই দুই মহাতারকা নিজেদের ফুটবলীয় জাদুতে বছরের পর বছর ধরে এই পুরস্কার নিজেদের করে নিয়েছেন। তবে সময়ের আবর্তনে বিশ্ব ফুটবলের এই সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত পুরস্কারের মঞ্চে এক বড় ধরনের ওলটপালট এবং নতুনত্ব দেখতে পেয়েছেন ক্রীড়ামোদিরা।
মেসি-রোনালদোর সেই দীর্ঘ অধিপত্যের যুগের অবসানের পর ফুটবল বিশ্বে এক নতুন প্রজন্মের আগমন ঘটে। যার ধারাবাহিকতায় ব্যালন ডি’অরের গত আসরে ফুটবল দুনিয়াকে এক বিশাল চমক উপহার দেন ফরাসি ক্লাব প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি)-এর উইঙ্গার ওসমানে দেম্বেলে। সবাইকে পেছনে ফেলে তিনি গত আসরের মর্যাদাপূর্ণ ব্যালন ডি’অর পুরস্কারটি নিজের করে নেন, যা ফুটবল বিশ্লেষকদের কাছে ছিল অত্যন্ত নাটকীয় এবং চমকপ্রদ একটি ঘটনা। দেম্বেলের সেই অভাবনীয় জয়ের পর ব্যালন ডি’অরের ভবিষ্যৎ লড়াই এখন আরও বেশি উন্মুক্ত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
৭০ বছর পূর্তি এবং নতুন অধ্যায়ের সূচনা
ফুটবলীয় সংস্কৃতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র লন্ডনে এবারের অনুষ্ঠান আয়োজনের সিদ্ধান্তটিকে ব্যালন ডি’অরের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রথম বিজয়ী স্যার স্ট্যানলি ম্যাথিউস যেহেতু একজন ইংলিশ ফুটবলার ছিলেন, তাই ৭০ বছর পূর্তির এই মাহেন্দ্রক্ষণে তাঁর নিজ দেশের রাজধানী লন্ডনে এই ট্রফি হস্তান্তরের সিদ্ধান্তটি এক ভিন্নধর্মী তাৎপর্য বহন করছে।
এই ঐতিহাসিক স্থানান্তরের মাধ্যমে ব্যালন ডি’অরের প্রাতিষ্ঠানিক ও ভৌগোলিক ঐতিহ্যে নতুন এক মাত্রা যোগ হতে যাচ্ছে। আগামী ২৬ অক্টোবরের সেই কাঙ্ক্ষিত রাতে লন্ডনের জমকালো মঞ্চে বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষ তারকাদের উপস্থিতিতে ঘোষণা করা হবে এবারের সেরা ফুটবলারের নাম। প্যারিস থেকে লন্ডনে ভেন্যু পরিবর্তনের এই সাহসী ও ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত ফুটবল বিশ্বে ব্যালন ডি’অরের আবেদন ও গ্রহণযোগ্যতাকে আরও বহুমুখী করে তুলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সাথে, নতুন কোনো ফুটবলার এবার এই সোনালী ট্রফিটি নিজের করে নিয়ে ওসমানে দেম্বেলের মতো নতুন কোনো চমক সৃষ্টি করবেন কিনা, তা দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে পুরো ফুটবল বিশ্ব।
