ইরানে ৮৮ দিনের পর ইন্টারনেট ফেরায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া

প্রায় ৮৮ দিন আংশিকভাবে বন্ধ থাকার পর ইরানে পুনরায় সীমিত পরিসরে ইন্টারনেট সংযোগ চালু হয়েছে। তবে সংযোগ পুনরায় চালু হওয়ার পর সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়ায় স্বস্তির পাশাপাশি ব্যাপক ক্ষোভ, হতাশা এবং অনিশ্চয়তার চিত্রই বেশি দেখা গেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত মঙ্গলবার বিকেল পাঁচটার দিকে ইন্টারনেট আংশিকভাবে পুনরায় সচল হয়। দীর্ঘ সময় বিচ্ছিন্ন থাকার পর বহু ব্যবহারকারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুনরায় যুক্ত হয়ে বার্তা, ছবি ও পোস্ট আদান-প্রদান শুরু করেন। তবে এই সংযোগ পুনঃস্থাপনকে অনেকে পূর্ণ স্বাধীনতার প্রত্যাবর্তন হিসেবে না দেখে বরং নিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতির মধ্যে সীমিত অনলাইন প্রবেশাধিকার হিসেবে মূল্যায়ন করছেন।

তেহরানের ৪২ বছর বয়সী শিল্পী এলি জানান, ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে তিনি প্রথমবারের মতো অনলাইনে যুক্ত হতে সক্ষম হন। দীর্ঘ বিরতির পর ইন্টারনেটে ফিরে তিনি এবং তার স্বামী পুরোনো গান শুনতে শুনতে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, তারা ভেবেছিলেন এটি হয়তো স্বাধীনতার একটি ক্ষুদ্র অনুভূতি, যা দীর্ঘ সময় পর আবার পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে, অনেক ব্যবহারকারী সরকারের এই পদক্ষেপকে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করাকে সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে দেখছেন। তেহরানের আলোকচিত্রী মরিয়ম বলেন, পশ্চিমা গণমাধ্যম আংশিক ইন্টারনেট পুনরায় চালু হওয়াকে যেভাবে উদ্‌যাপন করছে, তা গ্রহণযোগ্য নয়। তার মতে, ইন্টারনেট কোনো বিশেষ সুবিধা নয়, বরং এটি একটি মৌলিক অধিকার। তিনি আরও জানান, দীর্ঘ সময় কাজ বন্ধ থাকায় তাকে পরিবারের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা নিতে হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতেও ইন্টারনেট সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়নি। বিশেষ করে মোবাইল ইন্টারনেট এবং হোয়াটসঅ্যাপসহ কিছু সেবা এখনো সীমিতভাবে কার্যকর রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জানুয়ারিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনের সময় প্রথমবার ব্যাপকভাবে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করা হয়। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কিত উত্তেজনা ও হামলার প্রেক্ষাপটে আরও কঠোর ডিজিটাল বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এই সময় অনেক ব্যবহারকারী ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক (ভিপিএন) ব্যবহার করে সীমিতভাবে অনলাইনে যুক্ত থাকার চেষ্টা করলেও অধিকাংশ মানুষ কার্যত দীর্ঘ সময় ডিজিটাল বিচ্ছিন্নতার মধ্যে ছিলেন।

ইন্টারনেট আংশিকভাবে ফিরে আসার পর সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই নিজেদের অবস্থাকে ‘সাময়িক মুক্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে আন্দোলনকারী ও সমালোচকদের একাংশের মতে, এই পরিস্থিতিকে পূর্ণ স্বাধীনতা হিসেবে দেখা যায় না। তাদের মতে, এটি বরং আরও নিয়ন্ত্রিত অনলাইন ব্যবস্থার অংশ হতে পারে, যেখানে সংযোগ থাকলেও তা কঠোর পর্যবেক্ষণের আওতায় থাকতে পারে।

আন্দোলনকারী মিনা বলেন, এই সীমিত সংযোগ পুনরুদ্ধারকে স্বাধীনতার লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। তার মতে, এটি ভবিষ্যতে আরও কঠোর নজরদারি বা নিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল ব্যবস্থার সম্প্রসারণের অংশ হতে পারে।

ইন্টারনেট পুনঃসংযোগের পর সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের ছবি ও তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে রয়েছে নিহতদের জানাজা, শোকাহত পরিবারের দৃশ্য এবং সংঘাত ও ধ্বংসের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোর ছবি। এসব দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে।

তেহরানের অধ্যাপক আমিন বলেন, বর্তমানে সামাজিক মাধ্যমে যেসব ভিডিও ও ছবি ছড়িয়ে পড়ছে, তার অনেকগুলোতেই কান্না ও শোকের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। তার মতে, এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং তারা জীবিকা, সামাজিক স্থিতি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।

বিদেশে অবস্থানরত ইরানিদের মধ্যেও এ বিষয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। প্যারিসে থাকা মানবাধিকারকর্মী মাহশিদ নাজেমি বলেন, ইন্টারনেট পুনরায় চালু হওয়ায় তিনি একদিকে স্বস্তি অনুভব করেছেন, অন্যদিকে উদ্বেগও রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, যেসব ব্যক্তি এখনো অনলাইনে যুক্ত হননি, তাদের বিষয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে—তারা গ্রেপ্তার হয়েছেন নাকি অন্য কোনো পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন, তা জানা সম্ভব হয়নি।

সব মিলিয়ে আংশিক ইন্টারনেট পুনঃপ্রবর্তনের পর ইরানের সামাজিক বাস্তবতায় স্বাভাবিকতা ফিরে আসার পরিবর্তে বরং নতুন করে অনিশ্চয়তা, নজরদারি এবং সামাজিক উদ্বেগের চিত্রই বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।