ইরানের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী বন্দর আব্বাসের একটি সামরিক স্থাপনায় আজ বৃহস্পতিবার নতুন করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনী সামরিক হামলা পরিচালনা করেছে। এই আকস্মিক সামরিক অভিযানের পরপরই আন্তর্জাতিক বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম একলাফে অনেকটা বৃদ্ধি পেয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সামরিক সংঘাতের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজার পরিস্থিতি অস্থির হয়ে উঠেছে।
মার্কিন বাহিনীর সামরিক অভিযান ও ড্রোনের ক্ষয়ক্ষতি
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড বা কেন্দ্রীয় কমান্ডের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে যে, আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের প্রধান পথ হরমুজ প্রণালির আশপাশের জলসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা এবং হুমকি সৃষ্টি করার অপরাধে ইরানের অত্যন্ত আধুনিক চারটি ড্রোন তাদের সামরিক বাহিনী সম্পূর্ণভাবে ভূপাতিত করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই আকাশপথের প্রতিরক্ষামূলক অভিযান এবং বন্দর আব্বাসের সামরিক স্থাপনায় সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনাটি বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাণিজ্যের অংশীজনদের মধ্যে নতুন করে সরবরাহ সংকটের শঙ্কা তৈরি করেছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যের সর্বশেষ পরিস্থিতি
মার্কিন সামরিক বাহিনীর এই নতুন হামলার খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরপরই বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হিসেবে পরিচিত ‘ব্রেন্ট ক্রুড’ বা ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের মূল্য এক ধাক্কায় ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম দাঁড়িয়েছে ৯৭ দশমিক ৮৩ ডলারে, যা ব্রিটিশ মুদ্রার হিসাবে ৭৩ দশমিক ১৫ পাউন্ডের সমান। এর পাশাপাশি খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে লেনদেন হওয়া অপরিশোধিত তেলের মূল্য বা ক্রুড অয়েলের দামও ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বৃদ্ধির ফলে সেখানে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের নতুন দাম দাঁড়িয়েছে ৯২ দশমিক ২২ ডলারে।
নিচে একটি সুবিন্যস্ত টেবিলের মাধ্যমে মার্কিন হামলার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রকৃত চিত্রটি সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো:
| জ্বালানি তেলের ধরন ও মানদণ্ড | মূল্য বৃদ্ধির শতকরা হার | ব্যারেলপ্রতি বর্তমান মূল্য (মার্কিন ডলার) | পাউন্ডের হিসাবে বর্তমান মূল্য |
| আন্তর্জাতিক ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেল | ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ | ৯৭ দশমিক ৮৩ ডলার | ৭৩ দশমিক ১৫ পাউন্ড |
| যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অপরিশোধিত তেল | ৪ দশমিক শূন্য শূন্য শতাংশ | ৯২ দশমিক ২২ ডলার | (উপাত্ত উপলব্ধ নয়) |
যুদ্ধবিরতি ও হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব
সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মধ্যে যখন একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর ছিল এবং বিগত তিন মাস ধরে চলমান ভয়াবহ সংঘাতের স্থায়ী অবসানের লক্ষ্যে দুই পক্ষের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা চলছিল, ঠিক তখনই এই আকস্মিক হামলার ঘটনাটি ঘটল। দীর্ঘদিনের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে, যার প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির সামগ্রিক দামের ওপর। উল্লেখ্য, সমগ্র বিশ্বের মোট উৎপাদিত খনিজ তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বা এলএনজির প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ সাধারণত এই সংকীর্ণ হরমুজ প্রণালি নামক আন্তর্জাতিক জলপথ দিয়েই বিভিন্ন দেশে পরিবাহিত হয়ে থাকে।
পূর্ববর্তী সংঘাত ও হুমকির প্রেক্ষাপট
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এই দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের অভ্যন্তরে আকস্মিক সামরিক হামলা চালানোর পরপরই তেহরান প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল। ইরান সরকার ঘোষণা করেছিল যে, তাদের সার্বভৌমত্বে আঘাত করা হলে তারা হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী যেকোনো আন্তর্জাতিক জাহাজ ও বাণিজ্যিক নৌযানের ওপর পাল্টা হামলা চালাবে। আজ বৃহস্পতিবারের এই মার্কিন হামলা এবং ইরানের ড্রোন ভূপাতিত করার ঘটনা মূলত সেই পূর্ববর্তী সংঘাতেরই একটি বিপজ্জনক ধারাবাহিকতা, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের জ্বালানি সংকটের জন্ম দিচ্ছে।
