জি- লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ৭ই আগস্ট ২০২৬, ৬:৪৩ পিএম

ঢাকায় যাওয়ার পথে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় একটি পরিবারের সুখের যাত্রা মুহূর্তেই পরিণত হয়েছে শোকাবহ ঘটনায়। সিলেট থেকে রাজধানীর উদ্দেশে রওনা হওয়া জাহাঙ্গীর আলমের পরিবারের সদস্যরা এখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তবে তাঁদের তিন বছরের কন্যা জায়ফা আর বেঁচে নেই। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয় হলো, গুরুতর আহত বাবা-মা এখনো জানেন না তাঁদের আদরের শিশুটি এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে।
দুর্ঘটনার সময় ১৬ বছর বয়সী জান্নাতুল বাসের জানালার পাশে বসে বাইরের দৃশ্য দেখছিল। তার পাশে ছিল ছোট ভাই মোহাম্মদ। বাসটির ডান পাশের আসনে বসেছিলেন বাবা জাহাঙ্গীর আলম ও মা নুরুন্নাহার। তাঁদের কোলে ছিল তিন বছরের শিশু জায়ফা।
পরিবারটির যাত্রা থেমে যায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ওসমানীনগর উপজেলার কাশীকাপন এলাকায়। সেখানে সিলেটমুখী বেঙ্গল পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে ঢাকামুখী ইউনিক পরিবহনের বাসটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের তীব্রতায় ইউনিক পরিবহনের বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশের খাদে পড়ে যায়। এতে বাসটির বহু যাত্রী আহত হন। গুরুতর আহত অবস্থায় সবাইকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা ছোট্ট জায়ফাকে মৃত ঘোষণা করেন।
সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের সামনে দাঁড়িয়ে দুর্ঘটনার বিভীষিকা স্মরণ করে জান্নাতুল কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানায়, তার ছোট বোন তখন বাবা-মায়ের কোলে ছিল। হঠাৎ বিকট শব্দ শোনা যায়। এরপর কী ঘটেছে, তা বুঝে ওঠার আগেই বাসটি খাদে পড়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যেই চারদিকে চিৎকার, আর্তনাদ ও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে।
দুর্ঘটনায় জান্নাতুল ও তার ভাই মোহাম্মদ তুলনামূলক কম আহত হলেও তাঁদের বাবা-মা গুরুতর জখম হন। জাহাঙ্গীর আলম বর্তমানে হাসপাতালের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন। তাঁর মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাত রয়েছে এবং তিনি প্রায় অচেতন অবস্থায় রয়েছেন। অন্যদিকে নুরুন্নাহার হাসপাতালের চতুর্থ তলায় ভর্তি আছেন। তাঁর মুখ, মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাতের চিকিৎসা চলছে।
পরিবারটির স্বজনদের জন্য সবচেয়ে কঠিন দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে আহত বাবা-মায়ের চিকিৎসার পাশাপাশি তাঁদের কাছে শিশুকন্যার মৃত্যুর খবর গোপন রাখা। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁদের শারীরিক অবস্থা এখনো সংকটাপন্ন। এমন অবস্থায় মানসিক ধাক্কা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছেন স্বজনেরা।
জাহাঙ্গীর আলম সিলেটের দক্ষিণ সুরমা এলাকায় টায়ার মেরামতের ব্যবসা করেন। তাঁর প্রতিবেশী ব্যবসায়ী হাসান আহমদ জানান, সকাল সাড়ে নয়টার দিকে জাহাঙ্গীরের ছোট ভাই ফোন করে দুর্ঘটনার খবর দেন। এরপর তিনি কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে হাসপাতালে ছুটে যান। সেখানে গিয়ে দেখেন পরিবারের সবাই আহত। পরে জানতে পারেন, ছোট্ট জায়ফা আর বেঁচে নেই।
হাসপাতালে আহতদের পাশে রয়েছেন পরিবারের অন্যান্য সদস্য ও আত্মীয়স্বজন। তাঁরা চিকিৎসকদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন এবং আহতদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে পরিবারের দুই শিশুকেও মানসিকভাবে সামলে রাখার চেষ্টা চলছে।
শেরপুর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আনিসুর রহমান জানান, শুক্রবার সকাল সাড়ে সাতটার দিকে ওসমানীনগরের কাশীকাপন এলাকায় দুটি যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষের পর ইউনিক পরিবহনের বাসটি সড়কের পাশের খাদে পড়ে যায়। দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই সাতজন নিহত হন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজনের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় অন্তত ২৫ জন আহত হয়েছেন। তাঁদের কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সড়ক দুর্ঘটনাটি আবারও মহাসড়কে নিরাপদ যাতায়াতের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে মুখোমুখি সংঘর্ষের মতো প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা প্রতিরোধে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ, চালকদের সতর্কতা, নিয়মিত যানবাহনের যান্ত্রিক পরীক্ষা এবং মহাসড়কে কার্যকর নজরদারির প্রয়োজনীয়তা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এদিকে নিহতদের স্বজনদের শোক এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করছেন স্থানীয়রা।
মন্তব্য