ব্রাজিল জাতীয় ফুটবল দলের চূড়ান্ত বিশ্বকাপ স্কোয়াডে নেইমার জুনিয়রের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। দীর্ঘ অনিশ্চয়তা ও আলোচনার পর ব্রাজিলের নতুন কোচ কার্লো আনচেলত্তি ২৬ সদস্যের বিশ্বকাপ দলে নেইমারের নাম অন্তর্ভুক্ত করেন। তবে স্কোয়াড ঘোষণার অল্প সময়ের মধ্যেই আবারও চোটে পড়েন এই তারকা ফরোয়ার্ড। এর পর থেকেই তাকে বিশ্বকাপ দলে রাখা এবং সম্ভাব্য খেলার সময় নিয়ে ব্রাজিলের ফুটবল অঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
ব্রাজিলের ক্রীড়া সাংবাদিক মাউরো সেজারো মনে করেন, নেইমারকে দলে রাখার পেছনে ক্রীড়াগত কারণের চেয়ে বাণিজ্যিক ও প্রচারণামূলক বিষয় বেশি প্রভাব ফেলেছে। ব্রাজিলের ইউওএল চ্যানেলের জনপ্রিয় ক্রীড়া আলোচনা অনুষ্ঠান ‘পসে জি বোলা’তে অংশ নিয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন।
অনুষ্ঠানে মাউরো সেজারো বলেন, “গত সোমবার আমরা যা দেখলাম, তা আসলে করুণ ও সস্তা মার্কেটিংয়ের নাটক ছাড়া আর কিছু নয়। পুরো বিষয়টি এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন আমরা এখনও ২০১৪ সালের ব্রাজিল দলে ফিরে গেছি।”
তিনি আরও বলেন, “২০১৪ সালে চোটাক্রান্ত নেইমারকে দলে রাখার পেছনে অন্তত ফুটবলীয় যুক্তি ছিল। এমনকি ২০১০ সালেও তাকে বিশ্বকাপ দলে নেওয়ার আলোচনা হয়েছিল, যদিও সে সময় কোচ দুঙ্গা তাকে নেননি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে নেইমার মাঠে যে ধরনের ফুটবল খেলছেন, তাতে তাকে বিশ্বকাপ স্কোয়াডে রাখার যৌক্তিকতা খুঁজে পাওয়া কঠিন।”
নেইমারের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স নিয়েও সমালোচনা করেন এই ব্রাজিলিয়ান সাংবাদিক। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে নেইমার তার আগের ফর্মে নেই এবং ক্লাব ফুটবলেও ধারাবাহিকতা দেখাতে পারছেন না। তিনি উদাহরণ হিসেবে ব্রাজিলিয়ান ক্লাব সান্তোসের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সের কথা উল্লেখ করেন। মাউরো বলেন, “সান্তোস নিজেদের মাঠে খেলেও প্যারাগুয়ের ক্লাব রেকোলেতার বিপক্ষে জয় পায়নি। সেই দলের বিপক্ষেও নেইমারের উপস্থিতি ম্যাচে পার্থক্য গড়ে দিতে পারেনি।”
মাউরো সেজারো মন্তব্য করেন, “নেইমার এখন আর আগের মতো মাঠ কাঁপানো ফুটবলার নন। তাকে জাতীয় দলে রাখা হচ্ছে প্রভাব ও অবস্থানের কারণে। পুরো বিষয়টি এখন মার্কেটিংকেন্দ্রিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
তিনি আরও দাবি করেন, শারীরিকভাবে পুরোপুরি ফিট না থাকা সত্ত্বেও নেইমারকে দলে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত ফুটবলীয় বাস্তবতার চেয়ে বাণিজ্যিক বিবেচনার প্রতিফলন। তার মতে, ব্রাজিল দলের অন্যতম জনপ্রিয় মুখ হওয়ায় নেইমারের উপস্থিতি বিশ্বকাপ ঘিরে প্রচারণা ও দর্শক আগ্রহ বাড়াতে সহায়ক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চোটের কারণে নেইমারের ক্যারিয়ার বারবার ব্যাহত হয়েছে। ক্লাব ও জাতীয় দল—উভয় পর্যায়েই তিনি একাধিকবার দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে ছিলেন। ইনজুরির কারণে ধারাবাহিকভাবে ম্যাচ খেলতে না পারায় তার ফিটনেস ও ম্যাচ-রিদম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ফলে বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে তিনি কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে ফুটবল বিশ্লেষকদের একাংশের মধ্যে।
অন্যদিকে, ব্রাজিল দলের সমর্থকদের একটি অংশ এখনও মনে করেন, অভিজ্ঞতা ও বড় ম্যাচে পারফর্ম করার সক্ষমতার কারণে নেইমার দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারেন। আন্তর্জাতিক ফুটবে দীর্ঘ সময় ধরে ব্রাজিলের অন্যতম প্রধান তারকা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। জাতীয় দলের জার্সিতে গোল ও অ্যাসিস্টের দিক থেকেও তিনি ব্রাজিলের অন্যতম সফল ফুটবলারদের একজন।
কার্লো আনচেলত্তি এখনও নেইমারের ভূমিকা ও সম্ভাব্য খেলার সময় নিয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি। তবে স্কোয়াডে অন্তর্ভুক্তির পর পুনরায় চোটে পড়ায় তার ফিটনেস পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। বিশ্বকাপ শুরুর আগে মেডিকেল টিমের মূল্যায়নের ভিত্তিতে তার মাঠে নামা ও ম্যাচে অংশগ্রহণের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
নেইমারকে ঘিরে এই বিতর্কের মধ্যেই ব্রাজিল বিশ্বকাপ প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছে। দলটির লক্ষ্য শিরোপা পুনরুদ্ধার করা হলেও স্কোয়াড নির্বাচন ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
