দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিধিমালায় ব্যাপক সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এই পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান দিক হলো, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোনো ধরনের কাগজের পোস্টার ব্যবহার করা যাবে না। নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ সম্প্রতি এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে বিধিমালা সংশোধন ও নির্বাচন আয়োজন সংক্রান্ত এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের অবতারণা করেন।
Table of Contents
বিধিমালায় প্রস্তাবিত প্রধান পরিবর্তনসমূহ
নির্বাচন কমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে অধিকতর অংশগ্রহণমূলক ও বিতর্কহীন করতে বেশ কিছু প্রচলিত নিয়মে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো নির্বাচনের নির্দলীয় রূপরেখা এবং প্রযুক্তিগত ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা। সংশোধিত বিধিমালায় নিম্নলিখিত পরিবর্তনগুলো অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে:
পোস্টারমুক্ত নির্বাচন: পরিবেশ রক্ষা এবং নির্বাচনী ব্যয় হ্রাসের লক্ষে পোস্টার ব্যবহারের প্রথা বাতিল করা হচ্ছে।
নির্দলীয় নির্বাচন: স্থানীয় সরকারের কোনো স্তরেই দলীয় প্রতীক ব্যবহার করা যাবে না। নির্বাচন সম্পূর্ণ নির্দলীয় ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হবে।
ভোটার স্বাক্ষরের বাধ্যবাধকতা বাতিল: নির্দলীয় প্রার্থীদের জন্য বর্তমানে বিদ্যমান ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থনসূচক স্বাক্ষরের বিধানটি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মনোনয়ন ও ভোটদান পদ্ধতি: অনলাইনে মনোনয়নপত্র দাখিলের বর্তমান বিধান এবং ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারের নিয়ম কার্যকর থাকছে না। নির্বাচন হবে সনাতন ব্যালট পেপারে।
প্রার্থিতায় অযোগ্যতা: পলাতক বা ফেরারি আসামিরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। বিশেষ করে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইনের মামলায় চার্জশিটভুক্ত আসামিদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ থাকবে না।
জামানত বৃদ্ধি: উপজেলা পরিষদ নির্বাচন ব্যতীত অন্যান্য সকল স্তরের নির্বাচনে প্রার্থীদের জামানতের পরিমাণ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে, যা বিধিমালা চূড়ান্ত হওয়ার পর সুনির্দিষ্টভাবে জানা যাবে।
নির্বাচনী সংস্কারের তুলনামূলক চিত্র
| বিষয়ের বিবরণ | বর্তমান বিধান/পদ্ধতি | প্রস্তাবিত নতুন বিধান |
| প্রচার মাধ্যম | পোস্টার ও ব্যানার ব্যবহার করা যায় | কোনো পোস্টার ব্যবহার করা যাবে না |
| প্রার্থী মনোনয়ন | দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের সুযোগ আছে | সম্পূর্ণ নির্দলীয় (প্রতীকহীন) |
| ভোট গ্রহণ পদ্ধতি | ইভিএম ব্যবহারের বিধান আছে | সরাসরি ব্যালট পেপারের মাধ্যমে |
| মনোনয়ন দাখিল | অনলাইন ও অফলাইন উভয় মাধ্যম | অনলাইন বিধান বাতিল, সরাসরি দাখিল |
| ১% ভোটারের স্বাক্ষর | স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক | এই বাধ্যবাধকতা বাতিল করা হচ্ছে |
| পোস্টাল ব্যালট | সীমিত পরিসরে ব্যবস্থা আছে | প্রবাসীদের জন্য পোস্টাল ভোট থাকছে না |
নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়সূচী ও প্রস্তুতি
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, পবিত্র ঈদুল ফিতরের পর সংশোধিত বিধিমালা চূড়ান্ত করার লক্ষে কমিশন বৈঠকে বসবে। জুন মাসের মধ্যেই বিধিমালা প্রণয়নের কাজ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী অক্টোবর মাস থেকে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের নির্বাচন শুরু হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছেন আব্দুর রহমানেল মাছউদ।
সুষ্ঠু নির্বাচনের চার স্তম্ভ ও কমিশনের অবস্থান
নির্বাচন কমিশনার একটি সুষ্ঠু ও সফল নির্বাচনের জন্য চারটি প্রধান প্রভাবকের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন:
১. সরকারের নিরপেক্ষতা: নির্বাচনের সময় সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার যদি নিরপেক্ষ থাকে এবং প্রশাসনকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়, তবেই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব।
২. রাজনৈতিক দলের আচরণ: দলগুলোকে সংঘর্ষ ও পেশিশক্তির রাজনীতি পরিহার করে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা সুস্থ নির্বাচনী পরিবেশের পূর্বশর্ত।
৩. কমিশনের দৃঢ়তা: নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব কোনো বাহিনী নেই, তাই নীতি ও আদর্শের জায়গায় কমিশনকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। অনিয়ম রোধে কমিশন প্রয়োজনে ভোটকেন্দ্র বন্ধ করার ক্ষমতা প্রয়োগ করবে।
৪. মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সততা: প্রিসাইডিং ও পোলিং অফিসারদের সততা ও নেতৃত্বের ওপর নির্বাচনের স্বচ্ছতা বহুলাংশে নির্ভর করে। কোনো প্রকার জালিয়াতি বা অনিয়ম সহ্য না করার মানসিকতা কর্মকর্তাদের মধ্যে থাকতে হবে।
পরিশেষে, নির্বাচন কমিশনার আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর আন্তরিক সহযোগিতায় একটি সহিংসতামুক্ত ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেওয়া সম্ভব হবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েনসহ যেকোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও প্রদান করেন তিনি।
