রাজধানী ঢাকার ডেমরা এলাকায় ৬ বছর বয়সী এক কন্যাসন্তানকে ধর্ষণের অভিযোগে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ২০ মে বুধবার, অভিযুক্ত কিশোরকে বিজ্ঞ আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তাকে গাজীপুরের টঙ্গী অথবা অন্য কোনো নির্ধারিত সরকারি কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে (কিশোর শোধনাগারে) পাঠানোর নির্দেশ প্রদান করেন। এর আগে, গত ১৯ মে মঙ্গলবার রাতে ডেমরার বাঁশেরপুল আমিনবাগ এলাকা থেকে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। অভিযুক্ত কিশোর তার পরিবারের সাথে স্থানীয় একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করত এবং সে পেশায় বা দৈনন্দিন জীবনে স্থানীয় বাসিন্দা হিসেবেই পরিচিত ছিল।
ঘটনার বিবরণ ও নির্মমতার প্রেক্ষাপট
মামলার এজাহার এবং ডেমরা থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, পূর্বপরিচয় এবং প্রতিবেশী হওয়ার সুবাদে ভুক্তভোগী শিশু এবং তার ছোট ভাই প্রায়ই অভিযুক্ত কিশোরের ঘরে খেলাধুলা ও আসা-যাওয়া করত। গত ১৮ মে রাত আনুমানিক সাড়ে ১০টার দিকে অভিযুক্ত কিশোর লিচু খাওয়ানোর প্রলোভন দেখিয়ে কৌশলে ওই শিশু এবং তার ভাইকে নিজের ঘরে ডেকে নিয়ে যায়। ঘরে নেওয়ার পর সে অত্যন্ত সুকৌশলে শিশুটির ভাইকে অন্য একটি কক্ষে খেলনা ও অন্যান্য সামগ্রী দিয়ে ব্যস্ত রেখে দেয়, যাতে সে মূল ঘটনা টের না পায়। এই সুযোগে অভিযুক্ত কিশোর শিশুটিকে সম্পূর্ণ আলাদা একটি নির্জন কক্ষে নিয়ে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে।
শারীরিক নির্যাতনের এক পর্যায়ে শিশুটি তীব্র যন্ত্রণায় চিৎকার ও কান্নাকাটি শুরু করলে পার্শ্ববর্তী কক্ষ থেকে তার ভাই দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। সেখানে সে নিজের বোনকে উদ্ধার করতে গিয়ে অভিযুক্ত কিশোরকে আপত্তিকর ও অপরাধজনক অবস্থায় দেখতে পায়। পরবর্তীতে ভাই-বোনের সম্মিলিত কান্নার শব্দ ও চিৎকার শুনতে পেয়ে তাদের মা তাৎক্ষণিকভাবে ওই ঘরে উপস্থিত হন এবং নিজ কন্যাকে রক্তাক্ত ও গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করেন। পরবর্তীতে মায়ের কাছে ভুক্তভোগী শিশুটি ঘটে যাওয়া ঘটনার বিস্তারিত ও রোমহর্ষক বিবরণ প্রকাশ করে।
আইনি পদক্ষেপ ও জরুরি চিকিৎসাসেবা
ঘটনার পরদিন অর্থাৎ ১৯ মে মঙ্গলবার রাতে ভুক্তভোগী শিশুর মা বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় ডেমরা থানায় অভিযুক্ত কিশোরের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পরপরই পুলিশ আইনগত প্রক্রিয়া ও আসামিকে গ্রেপ্তারের জন্য বিশেষ অভিযান শুরু করে। ধর্ষণের শিকার শিশুটি শারীরিকভাবে অত্যন্ত অসুস্থ ও সংকটাপন্ন হয়ে পড়লে ডেমরা থানা পুলিশ তাকে উদ্ধার করে জরুরি চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) পাঠায়। বর্তমানে শিশুটি হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) চিকিৎসাধীন রয়েছে। সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে তার প্রয়োজনীয় ডাক্তারি পরীক্ষা (ফরেনসিক টেস্ট) এবং মানসিক ট্রমা কাটানোর জন্য চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে।
গণপিটুনি, পুলিশি তৎপরতা ও বর্তমান পরিস্থিতি
ডেমরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মির্জা তাইফুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে গণমাধ্যমকে জানান, ঘটনার পরদিন ১৯ মে মঙ্গলবার বিকেলে স্থানীয় উত্তেজিত জনতা অভিযুক্ত কিশোরকে এলাকায় ঘোরাফেরা করতে দেখে চিনে ফেলে। এরপর বিক্ষুব্ধ জনতা তাকে আটক করে গণপিটুনি দেয়। খবর পেয়ে ডেমরা থানা পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে উত্তেজিত জনতার হাত থেকে অভিযুক্তকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে। উদ্ধারের পর পুলিশের হেফাজতে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে ডেমরা থানায় দায়ের করা নিয়মিত মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
যেহেতু গ্রেপ্তারকৃত কিশোরের বয়স জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শিশু আইন অনুযায়ী ১৭ বছর (অর্থাৎ ১৮ বছরের কম), তাই দেশের প্রচলিত শিশু আইন-২০১৩ অনুযায়ী তাকে প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণ কারাগারে না পাঠিয়ে, ২০ মে বুধবার আদালতের নির্দেশে নিরাপদ হেফাজত হিসেবে কিশোর শোধনাগারে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং আদালতে দ্রুত চার্জশিট দাখিলের জন্য আইনি কার্যক্রম যথাযথভাবে চালিয়ে যাচ্ছে।
