খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ই মে ২০২৬, ১১:৩১ পিএম

যে বয়সে অনেকেই পরিবারের দায়িত্ব ও সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার চিন্তায় ব্যস্ত থাকেন, সেই বয়সেই নিজের দীর্ঘদিনের অপূর্ণ শিক্ষাস্বপ্ন পূরণের পথে হাঁটছেন ফুলঝড়ি বেগম। সবচেয়ে ব্যতিক্রমী বিষয় হলো, তিনি এবার এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন নিজের ছেলের সঙ্গে একসঙ্গে। নাটোরের লালপুর উপজেলায় এই ঘটনা স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
নাটোর জেলার লালপুর উপজেলার দুড়দুড়িয়া ইউনিয়নের নওপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ফুলঝড়ি বেগম এবং তার ছেলে মনিরুল ইসলাম দুজনই মোহরকয়া নতুনপাড়া মাধ্যমিক কারিগরি ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী। চলতি বছর তারা একসঙ্গে এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। বর্তমানে তারা লালপুর উপজেলার মধুবাড়ি দাখিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছেন।
ফুলঝড়ি বেগমের জীবনের শুরু থেকেই ছিল নানা ধরনের সামাজিক ও পারিবারিক দায়িত্বের চাপ। অল্প বয়সে বিয়ে হওয়ার কারণে তার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। এরপর সংসার, সন্তান লালন-পালন এবং দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততায় শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ আর তৈরি হয়নি। তার স্বামী নজরুল ইসলাম জীবিকার প্রয়োজনে কখনো ভ্যান চালনা এবং কখনো দিনমজুরির কাজ করে সংসার পরিচালনা করেন। সীমিত আয়ের এই পরিবারে সন্তানদের শিক্ষার জন্য ধারাবাহিকভাবে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হয়েছে।
ফুলঝড়ি বেগম জানান, ছোটবেলায় বিয়ে হয়ে যাওয়ায় তিনি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। দীর্ঘ সময় ধরে তার মনে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার ইচ্ছা ছিল। তবে সংসার ও পারিবারিক দায়িত্বের কারণে তা সম্ভব হয়নি। এখন ছেলের সঙ্গে একসঙ্গে পরীক্ষা দিতে পারছেন বলে তিনি বিষয়টিকে আনন্দের হিসেবে দেখছেন। একই সঙ্গে তিনি সামাজিক নানা মন্তব্যের মুখোমুখি হলেও নিজের লক্ষ্য থেকে সরে আসেননি বলে উল্লেখ করেন।
মনিরুল ইসলাম জানান, মায়ের সঙ্গে একসঙ্গে পরীক্ষায় অংশ নিতে পেরে তিনি গর্ব অনুভব করছেন। তার ভাষায়, মা তাদের অনেক কষ্ট করে বড় করেছেন এবং এখন তাকে পড়াশোনায় আগ্রহী হতে দেখে তিনি আরও অনুপ্রাণিত হচ্ছেন। তিনি চান, তার মা ভবিষ্যতেও পড়াশোনা চালিয়ে যান।
পরিবারের প্রধান নজরুল ইসলাম বলেন, শিক্ষিত মা-ই শিক্ষিত জাতি গঠনে ভূমিকা রাখতে পারেন—এই বিশ্বাস থেকেই তিনি স্ত্রীর পড়াশোনার ইচ্ছাকে সমর্থন দিয়েছেন। সীমিত আয়ের মধ্যেও তিনি পরিবারের ব্যয় ও শিক্ষার খরচ একসঙ্গে বহন করার চেষ্টা করছেন এবং যতদূর সম্ভব স্ত্রীর শিক্ষাজীবন চালিয়ে যেতে সহায়তা করবেন বলে জানান।
এ ঘটনাটি স্থানীয় প্রশাসনের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। লালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জুলহাস হোসেন সৌরভ বলেন, এটি শুধু লালপুর নয়, বরং পুরো দেশের জন্য একটি অনুপ্রেরণামূলক দৃষ্টান্ত। তার মতে, বয়স শিক্ষার পথে কোনো বাধা নয়; ইচ্ছাশক্তি থাকলে যেকোনো বয়সেই শিক্ষা অর্জন সম্ভব। তিনি আরও জানান, ওই শিক্ষার্থীর পড়াশোনা অব্যাহত রাখতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হবে।
এই ঘটনা এলাকাজুড়ে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ ও অনুপ্রেরণার একটি নতুন বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে পারিবারিক সহায়তা ও ব্যক্তিগত ইচ্ছাশক্তি একসঙ্গে শিক্ষার পথে এগিয়ে যাওয়ার উদাহরণ তৈরি করেছে।
মন্তব্য