তরুণদের অংশগ্রহণে বীমা খাতের সম্ভাবনার উন্মোচন

নাইজেরিয়ার বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ন্যাশনাল ইনস্যুরেন্স কমিশন (NAICOM) দেশটির বীমা ও পেনশন খাতকে আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ভবিষ্যতমুখী করতে তরুণ প্রজন্মের সক্রিয় সম্পৃক্ততার ওপর জোর দিয়েছে। দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক অর্থনীতি, প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিস্তারের যুগে তরুণদের এই খাতের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসা এখন সময়ের অন্যতম দাবি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

লাগোসে অনুষ্ঠিত ‘বিজনেস টুডে’ এর ১০ম বার্ষিক সম্মেলনে এই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়। বীমা কমিশনার ও NAICOM-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ওলুসেগুন ওমোসেহিনের পক্ষে বক্তব্য প্রদান করেন সংস্থাটির লাগোস অপারেশন্স প্রধান ড. জুলিয়াস ওদেদে। “Youth Advantage: Redefining Insurance and Pensions for a New Era” শীর্ষক এই সম্মেলনে বক্তারা একমত হন যে, নাইজেরিয়ার বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী একদিকে যেমন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার উৎস, অন্যদিকে তাদের সঠিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা একটি বড় নীতিগত দায়িত্ব।

ওমোসেহিন তাঁর বক্তব্যে বলেন, বিশ্ব এখন এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে যেখানে প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত কাজের ধরন পরিবর্তন করছে এবং অর্থনৈতিক কাঠামো দ্রুত রূপান্তরিত হচ্ছে। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তরুণ প্রজন্ম, যারা কেবল ভবিষ্যতের অংশ নয়, বরং বর্তমান সময়েরও চালিকাশক্তি। তাই বীমা ও পেনশন খাতে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হলে খাতটি আরও শক্তিশালী ও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, তরুণদের আকৃষ্ট করতে হলে বীমা খাতে প্রচলিত জটিল ও কারিগরি ভাষা পরিহার করে সহজ, বোধগম্য ও ব্যবহারবান্ধব যোগাযোগ কৌশল গ্রহণ করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, অতিরিক্ত প্রযুক্তিগত ব্যাখ্যা তরুণদের আগ্রহ কমিয়ে দেয় এবং তাদের এই খাত থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।

NAICOM-এর চলমান সংস্কার উদ্যোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংস্থাটি ভোক্তা সুরক্ষা বৃদ্ধি, বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে বীমা খাতকে আরও শক্তিশালী করতে কাজ করছে। এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য কেবল নিয়ন্ত্রণ আরোপ নয়, বরং গ্রাহকের আস্থা অর্জন এবং দীর্ঘমেয়াদে খাতের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, শুধুমাত্র নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ দিয়ে এই খাতের কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সচেতনতা বৃদ্ধি, আর্থিক শিক্ষার প্রসার এবং তরুণদের মধ্যে বীমা সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করা। বিশেষ করে যারা জীবনের প্রারম্ভিক পর্যায়ে আর্থিক সিদ্ধান্ত নেয়, তাদের লক্ষ্য করেই এই প্রচেষ্টা জোরদার করা উচিত।

সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মেলভিনআফ্রিকার প্রধান কৌশলবিদ চিয়ামাকা উগো-ওবিদিকে। তিনি বলেন, বীমা ও আর্থিক পণ্য উন্নয়নের ক্ষেত্রে গ্রাহককেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি অপরিহার্য। ব্যবহারকারীদের চাহিদা ও অভিজ্ঞতা বিবেচনায় না এনে পণ্য তৈরি করলে তা বাজারে টেকসই হয় না। তাই পণ্য উন্নয়নের প্রতিটি ধাপে গ্রাহকদের সক্রিয়ভাবে যুক্ত করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান সময়ে ডেটা ও প্রযুক্তির গুরুত্ব অপরিসীম। আর্থিক সেবাগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন এবং একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে ব্যাংকিং, বীমা, পেনশন ও বিনিয়োগ সেবা প্রদান করা এখন সময়ের দাবি। গ্রাহকরা আর একাধিক অ্যাপ ব্যবহার করতে চান না; বরং তারা একটি সহজ ও সমন্বিত ডিজিটাল অভিজ্ঞতা প্রত্যাশা করেন।

সম্মেলনে উত্থাপিত প্রধান সুপারিশসমূহ

বিষয়প্রস্তাবনা
তরুণ সম্পৃক্ততাবীমা ও পেনশন খাতে তরুণদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি
যোগাযোগ কৌশলসহজ ও ব্যবহারবান্ধব ভাষা প্রয়োগ
প্রযুক্তি ব্যবহারডিজিটালাইজেশন ও ওপেন ফাইন্যান্স বাস্তবায়ন
গ্রাহক সম্পৃক্ততাপণ্য উন্নয়নে ব্যবহারকারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত
আর্থিক শিক্ষাতরুণদের জন্য প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা কর্মসূচি

সম্মেলনের আয়োজক নেকেচি নায়েচে-এজেজোবোর বলেন, এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ছিল তরুণদের মধ্যে বীমা ও পেনশন খাত সম্পর্কে আগ্রহ তৈরি করা এবং প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করা। একই সঙ্গে এই খাতের সম্ভাবনাগুলো তুলে ধরে নতুন প্রজন্মকে এতে সম্পৃক্ত করা।

নাইজেরিয়ান কাউন্সিল অব রেজিস্টার্ড ইনস্যুরেন্স ব্রোকার্সের (NCRIB) প্রেসিডেন্ট একেওমা এজেইবে বীমা খাতকে একীভূতভাবে এগিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দেন এবং তরুণদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান।

ইউনিট্রাস্ট ইনস্যুরেন্স কোম্পানির প্রধান নির্বাহী আদেবায়ো আরোওয়োজোলু বীমা ও পেনশনকে আর্থিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে উল্লেখ করেন। অন্যদিকে, নাইজেরিয়ান ইনস্যুরেন্স রিফর্ম অ্যাক্ট ২০২৫-এর ইতিবাচক দিক তুলে ধরে বাবাতুন্ডে ওগুনতাদে বলেন, নতুন আইন খাতটিকে আরও বিনিয়োগবান্ধব ও শক্তিশালী করেছে।

চার্টার্ড ইনস্যুরেন্স ইনস্টিটিউট অব নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট ইয়েতুন্ডে ইলোরি জানান, এক মিলিয়ন তরুণকে বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ দেওয়ার একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে, যা তাদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে।

সমগ্র আলোচনায় একটি বিষয় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে—তরুণদের সক্রিয় সম্পৃক্ততা ছাড়া বীমা ও পেনশন খাতের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই প্রযুক্তিনির্ভর, উদ্ভাবনী এবং তরুণবান্ধব একটি বীমা কাঠামো গড়ে তোলাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ।