খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ই জুন ২০২৬, ১২:৯ এএম

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় চট্টগ্রামে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত ও সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীকে আজ বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে। তবে শারীরিক অসুস্থতা চরমে থাকায় তাঁকে এজলাসের ভেতরে প্রথাগত কাঠের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায়নি। পুরো আদালত চলাকালীন তিনি ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে পার্ক করে রাখা একটি বিশেষ অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরেই শয্যাশায়ী অবস্থায় ছিলেন। সেখানে রেখেই তাঁর আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। বিচারকাজ শেষে বেলা আড়াইটার দিকে ওই অ্যাম্বুলেন্সে করেই কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তাঁকে আবার হাসপাতাল প্রাঙ্গণে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ সাংবাদিকদের এই বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
Table of Contents
প্রসিকিউশন ও আদালত সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, সাবেক এই প্রভাবশালী সংসদ সদস্য বর্তমানে হৃদরোগসহ বেশ কিছু জটিল ও গুরুতর শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। এই অসুস্থতার কারণে আদালতের নির্দেশে তিনি বেশ কিছুদিন ধরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) প্রিজন সেলে চিকিৎসাধীন আছেন। আজ সকালে হাসপাতাল থেকে সরাসরি একটি লাইফ সাপোর্ট সম্বলিত অ্যাম্বুলেন্সে করে তাঁকে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে নিয়ে আসা হয়। আইনি প্রক্রিয়া ও শুনানি চলাকালীন চিকিৎসকদের পরামর্শ এবং তাঁর নাজুক শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃপক্ষ তাঁকে এজলাসে না তুলে অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরেই রাখার বিশেষ অনুমতি প্রদান করেন।
চট্টগ্রামে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ওপর নৃশংস হামলার ঘটনায় দায়ের করা এই মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মোট আসামির সংখ্যা ২২ জন। আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর এই মামলায় সাবেক এমপি ফজলে করিম চৌধুরীসহ এখন পর্যন্ত মাত্র পাঁচজন আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পেরেছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। মামলার বাকি ১৭ জন আসামি এখনো অধরা ও পলাতক রয়েছেন। এই পলাতকদের তালিকায় রয়েছেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এবং সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলসহ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের বেশ কয়েকজন হেভিওয়েট ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা। তাদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানা গেছে।
আজকের শুনানিতে ফজলে করিম চৌধুরীর পক্ষে নিযুক্ত আইনজীবী তাঁর মক্কেলকে এই সুনির্দিষ্ট মামলা থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি বা খালাস দেওয়ার পক্ষে ট্রাইব্যুনালের সামনে নানামুখী আইনি যুক্তি ও নথিপত্র তুলে ধরেন। ডিফেন্স কাউন্সেল দাবি করেন, ঘটনার সাথে তাঁর মক্কেলের সরাসরি কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। তবে দীর্ঘ শুনানির পরও আজ আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন পুরোপুরি শেষ করা সম্ভব হয়নি। আদালত প্রাঙ্গণে উভয় পক্ষের বক্তব্য আংশিক শোনার পর ট্রাইব্যুনাল আগামী রোববার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছেন। ওই দিন ফজলে করিমের অব্যাহতির আবেদনের পক্ষে তাঁর আইনজীবী পুনরায় আদালতের সামনে বাকি যুক্তিতর্ক পেশ করার সুযোগ পাবেন।
প্রসিকিউশনের দায়ের করা এই মামলায় অভিযুক্ত ২২ জন আসামির বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের রাজপথে সংঘটিত অপরাধের প্রধানত তিনটি সুনির্দিষ্ট ও ভয়াবহ অভিযোগ আনা হয়েছে। যেখানে মোট ছয়জন ছাত্র-জনতাকে ঠান্ডা মাথায় গুলি করে হত্যা এবং শতাধিক মানুষকে আজীবনের জন্য পঙ্গু ও গুরুতর আহত করার লোমহর্ষক বিবরণ রয়েছে:
প্রথম অভিযোগ: ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে প্রকাশ্য দিবালোকে মো. ওয়াসিম আকরাম, ফয়সাল আহমেদ শান্ত ও মো. ফারুককে গুলি করে হত্যা করা।
দ্বিতীয় অভিযোগ: এর ঠিক দুদিন পর অর্থাৎ ১৮ জুলাই একই ঘটনার ধারাবাহিকতায় তানভীর সিদ্দিকী, মো. সাইমন ও হৃদয় চন্দ্রকে নির্মমভাবে ও নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা।
তৃতীয় অভিযোগ: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পুরো সময়জুড়ে চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারী সাধারণ মানুষের ওপর নির্বিচারে লাঠিসোঁটা ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে শতাধিক মানুষকে গুরুতর জখম ও অঙ্গহানি করা।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এই গুরুতর অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে মামলার পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এগিয়ে নিচ্ছেন। আগামী রোববারের শুনানির পর মামলাটির পরবর্তী ধাপ বা চার্জ গঠনের বিষয়ে ট্রাইব্যুনাল তাঁদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবেন।
মন্তব্য