খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ই জুন ২০২৬, ১২:১ এএম

ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম, জালিয়াতি ও দুর্নীতির মাধ্যমে দেশের বাইরে পাচার হয়ে যাওয়া খেলাপি ঋণের অর্থ উদ্ধারে বড় ধরনের আন্তর্জাতিক উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সংকটে পড়া প্রায় ৩০টি ব্যাংকের হারিয়ে যাওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারে বিশ্বখ্যাত ৯টি আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট (এনডিএ) বা গোপনীয়তা চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়াটি এগোচ্ছে ‘নো উইন, নো ফি’ চুক্তিতে। এর মানে হলো, প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থ উদ্ধার করতে পারলেই কেবল তাদের পারিশ্রমিক বা ফি দেওয়া হবে, অন্যথায় নয়। প্রাথমিক ধাপে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, ব্যবসায়ী এস আলম এবং বেক্সিমকো, সিকদার, নাসা ও ওরিয়ন গ্রুপের মতো প্রভাবশালী মহলের ছয়টি সুনির্দিষ্ট মামলার ওপর ভিত্তি করে এই আইনি কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
আজ বুধবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে কুড়িগ্রাম-১ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল ইসলামের এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানান। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বিকেল তিনটায় শুরু হওয়া এই অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বটি টেবিলে উপস্থাপিত হয়। অর্থমন্ত্রী সংসদকে জানান, এই আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠানগুলো অভিযুক্ত ঋণখেলাপিদের বিদেশে থাকা গোপন সম্পদ ও অর্থ সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করবে এবং তা আইনি প্রক্রিয়ায় দেশে ফিরিয়ে আনতে দেশীয় ব্যাংকগুলোকে সব ধরনের কারিগরি ও আইনি সহায়তা দেবে। আগামীতে এই কার্যক্রমের পরিধি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
Table of Contents
চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহম্মেদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী দেশের ব্যাংকিং খাতের একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, দেশে বর্তমানে মোট ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ১৯ কোটি ৩২ লাখ ৫১ হাজার ২৩২টি। এর মধ্যে সাধারণ মানুষের সঞ্চয়ী হিসাব ১৭ কোটি ৭৯ লাখ ৫০ হাজার ৪chess৬৫টি এবং বিভিন্ন ধরনের ঋণ হিসাবের সংখ্যা ১ কোটি ৫৩ লাখ ৭৬৭টি। ২০২৬ সালের মধ্যে দেশের শতভাগ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে ব্যাংকিং ও আধুনিক আর্থিক সেবার আওতায় আনতে সরকার কাজ করছে। এজন্য ‘জাতীয় আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কৌশল’ (এনএফআইএস) কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বর্তমানে দেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির হার দাঁড়িয়েছে ৬৪ দশমিক ৫০ শতাংশে।
এদিকে, জামালপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী দেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণের একটি পরিষ্কার হিসাব দেন। তিনি জানান, ২০২৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৭৮ হাজার ২৩৩ দশমিক ৪৪৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (যা প্রায় ৭৮.২৩ বিলিয়ন ডলার)। এই ঋণের চরিত্রগত বিন্যাস মূলত দুই ভাগে বিভক্ত:
কনসেশনাল ঋণ (নমনীয় শর্তের ঋণ): মোট ঋণের ৬১ দশমিক privacy৭ শতাংশ।
নন-কনসেশনাল ঋণ (কঠিন শর্তের ঋণ): মোট ঋণের ৩৮ দশমিক ০৩ শতাংশ।
ময়মনসিংহ-৮ আসনের লুৎফুল্লাহেল মাজেদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, দেশে নিবন্ধিত রাজস্ব প্রদানকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। বর্তমানে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৩৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৬-তে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১১ দশমিক ৮৬ শতাংশ বেশি।
তবে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আদায়ে কিছুটা ঘাটতি রয়ে গেছে। সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১ লাখ ৭১ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা। এর বিপরীতে বছর শেষে আদায় করা সম্ভব হয়েছে ১ লাখ ২৯ হাজার ৯০ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, যা মূল লক্ষ্যমাত্রার ৭৫ দশমিক ৩০ শতাংশ।
অন্যদিকে, দেশের প্রান্তিক কৃষকদের ঋণের বোঝা হালকা করতে একটি বড় মানবিক উদ্যোগের কথা জানান অর্থমন্ত্রী। গাইবান্ধা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ شামীম কায়সারের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ কর্মসূচির আওতায় চলতি অর্থবছরে ১ হাজার ৫৬৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সরকারের এই বিশেষ ছাড়ের কারণে সরাসরি উপকৃত হয়েছেন দেশের ১৪ লাখ ১৪ হাজার ৪৩১ জন প্রান্তিক কৃষক।
ব্যাংকিং খাতের সাম্প্রতিক তারল্যসংকট নিয়ে সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য মোসাম্মৎ শাম্মী আক্তারের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী সাধারণ আমানতকারীদের আশ্বস্ত করেন। তিনি বলেন, অর্থসংকটে ভুগতে থাকা ব্যাংকগুলো যাতে গ্রাহকদের চাহিদামতো আমানতের টাকা ফেরত দিতে পারে, সেজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নিয়মিত জরুরি তারল্যসহায়তা বা ক্যাশ সাপোর্ট দেওয়া হচ্ছে। গত ১৫ জুন পর্যন্ত জরুরি তারল্যসহায়তা হিসেবে বিভিন্ন ব্যাংককে মোট ৭৫ thousand ৯০৩ কোটি ১১ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। সিরাজগঞ্জ-৫ আসনের আমিরুল ইসলাম খানের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, বর্তমানে দেশে ৬৩টি ব্যাংক ১১ হাজার ৩২৬টি শাখা এবং ৪ হাজার ৯২৯টি উপশাখার মাধ্যমে তাদের ব্যাংকিং সেবা সচল রেখেছে।
সংসদে একীভূত হওয়া পাঁচ ইসলামী ব্যাংক নিয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করেন অর্থমন্ত্রী। এক্সপোর্ট ইমপোর্ট ব্যাংক অব বাংলাদেশ (এক্সিম ব্যাংক), ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংককে ‘ব্যাংক রেজোল্যুশন স্কিম-২০২৫’-এর আওতায় আনা হয়েছে। এসব ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ‘আমানত সুরক্ষা আইন-২০২৬’ অনুযায়ী সুরক্ষিত আমানতের সীমা ১ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করা হয়েছে। এর ফলে কোনো ব্যাংক বন্ধ বা দেউলিয়া হলেও প্রত্যেক গ্রাহক নিশ্চিতভাবে আইনগতভাবে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা দ্রুত ফেরত পাবেন। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের চলতি হিসাবে আমানত সুরক্ষা তহবিল থেকে ইতিমধ্যে ১২ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া অন্যান্য যেসব ব্যাংক তারল্যসংকটে ভুগছে, সেগুলোর সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন বিভাগ কাজ করছে। প্রয়োজনে ‘ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন, ২০২৬’ অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য সেলিনা সুলতানার প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী দেশের কর কাঠামোতে একটি বড় পরিবর্তনের আভাস দেন। তিনি জানান, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে করের আওতা বা পরিধি আরও বাড়াতে মুদির দোকান ও বিউটি পারলারসহ বেশ কয়েকটি নতুন ব্যবসায়ী খাতকে ভ্যাটের আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে সরকার।
নতুন করে ভ্যাটের আওতায় আসতে যাওয়া খাতগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
তৈরি পোশাক ও কাপড়ের খুচরা বিক্রেতা, কনফেকশনারি ও কসমেটিকসের দোকান।
প্লাস্টিক ও সিরামিকের গৃহস্থালি পণ্য, জুতার দোকান ও হার্ডওয়্যার ব্যবসা।
ডেকোরেটরস, মোবাইল ফোন, এসি, ফ্রিজ, ওভেন ও অন্যান্য ইলেকট্রনিকস পণ্যের শোরুম।
পেইন্ট, স্যানিটারি ও ফিটিংস, টাইলস, ঢেউটিন, রড ও সিমেন্টের ব্যবসা।
ফার্নিচার শোরুম, মিষ্টান্ন ভান্ডার এবং রেস্টুরেন্ট ব্যবসা।
মন্ত্রী জানান, এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশীয় ভ্যাট বাবদ মোট ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছিল। নতুন এই খাতগুলো যুক্ত হলে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায় আরও গতিশীল হবে বলে মনে করছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
মন্তব্য