মাহবুবা রহমানের জীবনাবসান

বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী মাহবুবা রহমান আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় তিনি গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। তাঁর মৃত্যুতে দেশের সংগীত ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

১৯৩৫ সালে জন্মগ্রহণ করা মাহবুবা রহমান শৈশব থেকেই সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন। একটি সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠার কারণে অল্প বয়সেই তিনি সংগীতচর্চায় যুক্ত হন। মাত্র ১২ বছর বয়সে তাঁর কণ্ঠ প্রথমবারের মতো তৎকালীন আকাশবাণী ঢাকা কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয়, যা তাঁর শিল্পীজীবনের এক ঐতিহাসিক সূচনা হিসেবে বিবেচিত হয়। সেই সময় থেকেই তাঁর কণ্ঠ শ্রোতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে শুরু করে।

পঞ্চাশ ও সত্তরের দশকে তিনি বেতার ও চলচ্চিত্রে একজন জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। বিশেষ করে পল্লীগীতি ও আধুনিক গানে তাঁর আবেগঘন, মসৃণ এবং সুরেলা কণ্ঠ তাঁকে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়। তাঁর গাওয়া গানগুলো শুধু বিনোদনের মাধ্যমই ছিল না, বরং বাঙালি সংস্কৃতির আবেগ ও অনুভূতির এক গভীর প্রতিফলন হিসেবেও বিবেচিত হতো।

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’-এ তিনি যে গান পরিবেশন করেন, তা তাঁকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। এই চলচ্চিত্রে তাঁর কণ্ঠে গাওয়া গান “মনের বনে দোলা লাগে” দর্শক-শ্রোতাদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং চলচ্চিত্র সংগীতের অগ্রযাত্রায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। এছাড়া তাঁর কণ্ঠে গাওয়া “নিরালা রাতের প্রথম প্রহরে”, “তোমাকে ভালোবেসে অবশেষে কী পেলাম”সহ বহু গান আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে গভীরভাবে গেঁথে আছে।

দীর্ঘ সংগীতজীবনে তিনি অসংখ্য জনপ্রিয় গান উপহার দিয়েছেন এবং নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছেন। তাঁর কণ্ঠের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল আবেগের গভীরতা, নিখুঁত সুর নিয়ন্ত্রণ এবং স্পষ্ট উচ্চারণ, যা তাঁকে সমকালীন শিল্পীদের মধ্যে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। তিনি শুধু একজন শিল্পীই ছিলেন না, বরং সংগীতের একটি যুগের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হতেন।

তাঁর জীবন ও শিল্পীজীবনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিচে সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো—

বিষয়তথ্য
জন্ম১৯৩৫ সাল
সংগীতজীবনের সূচনা১২ বছর বয়সে আকাশবাণী ঢাকা কেন্দ্র
চলচ্চিত্রে অবদান‘মুখ ও মুখোশ’ চলচ্চিত্রে গান পরিবেশন
উল্লেখযোগ্য গানমনের বনে দোলা লাগে, নিরালা রাতের প্রথম প্রহরে, তোমাকে ভালোবেসে অবশেষে কী পেলাম
ঘরানাপল্লীগীতি ও আধুনিক গান
প্রাপ্ত সম্মাননাএকুশে পদক
মৃত্যুর সময়বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা, ঢাকা

মাহবুবা রহমানের প্রয়াণে দেশের সংগীতাঙ্গন এক অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়েছে। তাঁর সহকর্মী, অনুরাগী এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তাঁরা মনে করেন, তাঁর কণ্ঠে পরিবেশিত গানগুলো বাঙালি সংগীতের ইতিহাসে এক অমূল্য সম্পদ হিসেবে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর সৃষ্টিশীলতা ও অবদান আগামী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।