মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান প্রত্যক্ষ সংঘাতের ১০ দিন অতিবাহিত হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই ভয়াবহ যুদ্ধে মার্কিন বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতির একটি উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, চলমান এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত প্রায় ১৫০ জন মার্কিন সেনাসদস্য আহত হয়েছেন। একই সময়ে ইরানের হামলায় অন্তত আটজন মার্কিন সেনার মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে।
ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যান ও পেন্টাগনের স্বীকারোক্তি
প্রাথমিকভাবে পেন্টাগন কেবল আটজন সেনার গুরুতর আহত হওয়ার খবর দিলেও রয়টার্সের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর তারা অবস্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। মঙ্গলবার মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন এক বিবৃতিতে জানায় যে, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত আনুমানিক ১৪০ থেকে ১৫০ জন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন। তবে পেন্টাগনের দাবি অনুযায়ী, আহতদের অধিকাংশের আঘাতই আশঙ্কাজনক নয়।
নিচে গত ১০ দিনের যুদ্ধে মার্কিন বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতির একটি সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যান তুলে ধরা হলো:
| বিষয়ের বিবরণ | পরিসংখ্যান/তথ্য |
| নিহত মার্কিন সেনা | ৮ জন |
| আহত মার্কিন সেনা (মোট) | প্রায় ১৫০ জন (আনুমানিক) |
| গুরুতর আহত সেনা | ৮ জন (উন্নত চিকিৎসাধীন) |
| কর্মে ফিরেছেন | ১০৮ জন |
| অভিযানের নাম | অপারেশন এপিক ফিউরি |
| সংঘাতের স্থায়িত্ব | ১০ দিন (২৮ ফেব্রুয়ারি – ১০ মার্চ) |
আঘাতের ধরণ ও চিকিৎসা পরিস্থিতি
পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল জানিয়েছেন, আহত ১০৮ জন সেনা প্রাথমিক চিকিৎসার পর আবারও তাদের দায়িত্ব পালনে সক্ষম হয়েছেন। তবে চিকিৎসাধীন বাকিদের আঘাতের ধরণ নিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ফলে সৃষ্ট প্রচণ্ড বিস্ফোরণের কারণে অনেক সেনাসদস্য ‘ট্রমাটিক ব্রেইন ইনজুরি’ (টিবিআই) বা বিস্ফোরণজনিত মানসিক ও স্নায়বিক আঘাতের শিকার হয়েছেন। যুদ্ধের ময়দানে এই ধরণের আঘাত সাধারণত তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা না গেলেও পরবর্তীতে তা দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি করে।
রণক্ষেত্রের বাস্তবতা ও ইরানের প্রতিরোধ
মার্কিন সামরিক বিশ্লেষকরা ধারণা করেছিলেন যে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলো দ্রুত ধ্বংস করা সম্ভব হবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। গত ১০ দিনে ইরান কেবল ইসরায়েল নয়, বরং সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতেও নিরবচ্ছিন্ন হামলা চালিয়েছে। বিশেষ করে আরব উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল অবকাঠামো এবং কৌশলগত বিমানবন্দরগুলো লক্ষ্য করে ইরানের প্রতিশোধমূলক আক্রমণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন অবশ্য মার্কিন সামরিক সক্ষমতা নিয়ে আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেছেন। মঙ্গলবার এক ব্রিফিংয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ইরান লড়াই করছে এবং তাদের বীরত্বকে তিনি সম্মান জানান, তবে তারা মার্কিন বাহিনীর ধারণার চেয়ে বেশি শক্তিশালী—এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। তার মতে, মার্কিন বাহিনী অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে ইরানের অস্ত্রের মজুত ধ্বংস করে দিচ্ছে এবং শীঘ্রই তারা পরিস্থিতির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হবে।
ভবিষ্যৎ শঙ্কা
মার্কিন সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, যুদ্ধের পরিকল্পনা করার সময় ইরানের যে সক্ষমতার কথা চিন্তা করা হয়েছিল, ইরান তার চেয়েও বেশি কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। বিশেষ করে ইরানের হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যস্ত রাখছে। এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে মার্কিন বাহিনীর হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে, যা ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় ধরণের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।









