২৩ মে: রংপুরের নিসবেতগঞ্জ বধ্যভূমির রক্তঝরা ইতিহাস

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ২৩ মে রংপুরের ইতিহাসে এক কলঙ্কিত ও বিভীষিকাময় দিন হিসেবে চিহ্নিত। এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের স্থানীয় দোসররা রংপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে নিরীহ বাঙালি ও বুদ্ধিজীবীদের ধরে নিয়ে গিয়ে বর্বরোচিত নিসবেতগঞ্জ বধ্যভূমিতে নির্মমভাবে হত্যা করে। বিশেষ করে রংপুর শহরের লিচু বাগান, গোমস্তাপাড়া, দেওয়ানবাড়ি রোড ও নিসবেতগঞ্জ সংলগ্ন এলাকায় এই নারকীয় তাণ্ডব চালানো হয়।

বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট ও শৈলেন দত্তের আত্মত্যাগ

২৩ মে রোববার রাতে পাকিস্তানি সেনারা স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় শহরের বিভিন্ন বাড়িতে তল্লাশি চালায়। তারা ইলেকট্রিক মিস্ত্রি শৈলেন দত্তকে তার নিজ বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। সে সময় তিনি রাতের আহার করছিলেন। একই রাতে তারা বিশিষ্ট ব্যবসায়ী শংকর বণিক এবং প্রবীণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট পূর্ণচন্দ্র সরকারকে গ্রেপ্তার করে।

শৈলেন দত্তের ওপর চালানো হয়েছিল ইতিহাসের অন্যতম জঘন্যতম নিষ্ঠুরতা। তাকে জিপের পেছনে দুই পা বেঁধে জীবন্ত অবস্থায় টেনে নিয়ে যাওয়া হয়। নিসবেতগঞ্জ যাওয়ার দীর্ঘ পথে পাথুরে ও ধুলোবালি রাস্তার ঘর্ষণে তার শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। তার আর্তচিৎকারে আশেপাশের পরিবেশ ভারী হয়ে উঠলেও পাকিস্তানি ঘাতকদের মনে দয়ার উদ্রেক হয়নি। পরদিন কেবলমাত্র তার রক্তমাখা লুঙ্গিটি খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল।

নিসবেতগঞ্জ বধ্যভূমি ও শহীদ বুদ্ধিজীবীগণ

নিসবেতগঞ্জ বধ্যভূমি ছিল রংপুরের সবচেয়ে বড় বধ্যভূমিগুলোর একটি। ২৩ মে থেকে শুরু করে পরবর্তী কয়েক দিনে এখানে অর্ধশতাধিক মানুষকে হত্যা করা হয়। এই হত্যাযজ্ঞের অন্যতম লক্ষ্য ছিল স্থানীয় বুদ্ধিজীবী সমাজকে নিশ্চিহ্ন করা। রংপুরের প্রথিতযশা আইনজীবী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অ্যাডভোকেট বিজয় চন্দ্র মৈত্র (যিনি ‘পাখিদা’ নামে পরিচিত ছিলেন) এই বর্বতার শিকার হন। তাকে শুভাকাঙ্ক্ষীরা দেশ ত্যাগের পরামর্শ দিলেও তিনি মাতৃভূমির প্রতি মমত্ববোধ থেকে থেকে গিয়েছিলেন। ২৫ মে মধ্যরাতে তাকে তুলে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়।

নিসবেতগঞ্জ বধ্যভূমির প্রধান শহীদদের তালিকা:

শহীদের নামপেশা / পরিচয়হত্যাকাণ্ডের প্রকৃতি
শৈলেন দত্তইলেকট্রিক মিস্ত্রিজিপের পেছনে বেঁধে টেনে হত্যা
অ্যাডভোকেট পূর্ণচন্দ্র সরকারপ্রবীণ আইনজীবীগ্রেপ্তার পরবর্তী গুলি করে হত্যা
শংকর বণিকবিশিষ্ট ব্যবসায়ীগ্রেপ্তার পরবর্তী গুলি করে হত্যা
বিজয় চন্দ্র মৈত্র (পাখিদা)আইনজীবী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব২৫ মে মধ্যরাতে বধ্যভূমিতে হত্যা
অজ্ঞাতনামা অর্ধশতাধিক বাঙালিসাধারণ নাগরিক ও ছাত্রগণকবর ও বধ্যভূমিতে হত্যা

ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও উত্তরাধিকার

২৩ মে’র এই আত্মত্যাগ রংপুরের মুক্তিকামী মানুষকে আরও বেশি উদ্বুদ্ধ করেছিল। পাকিস্তানি বাহিনীর উদ্দেশ্য ছিল ভীতি সৃষ্টি করে বাঙালিদের স্তব্ধ করে দেওয়া, কিন্তু নিসবেতগঞ্জের এই রক্তপাত শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধের দাবানলে পরিণত হয়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ২৩ মে তাই শোকের পাশাপাশি অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপোষহীন থাকার প্রেরণা হিসেবে বিবেচিত। নিসবেতগঞ্জের বধ্যভূমি আজও সেই স্মৃতি বহন করছে, যেখানে অসংখ্য নাম না জানা বীর শহীদের রক্ত মিশে আছে।

শহীদ বিজয় চন্দ্র মৈত্রসহ অন্যান্য শহীদদের আদর্শ ও দেশপ্রেম পরবর্তী প্রজন্মের কাছে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম মানচিত্রের ভিত্তি হিসেবে অমর হয়ে আছে। প্রতি বছর এই দিনে স্থানীয় বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন শহীদদের স্মরণে পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং আলোচনা সভার আয়োজন করে থাকে। তাদের এই ঋণ কোনোদিন শোধ হওয়ার নয়; বরং এটি বাঙালির ইতিহাসে এক চিরস্থায়ী শোকগাঁথা হিসেবে সংরক্ষিত থাকবে।