১৬ বছর পর ফুটবল বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ড: ২৬ সদস্যের দল ঘোষণা

দীর্ঘ ১৬ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ফিফা বিশ্বকাপের মূল আসরে জায়গা করে নিয়েছে ওশেনিয়া অঞ্চলের দেশ নিউজিল্যান্ড। আসন্ন এই বিশ্বমঞ্চের লড়াইকে সামনে রেখে ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত দল ঘোষণা করেছেন দলটির প্রধান কোচ ড্যারেন বেজলি। অভিজ্ঞ এবং তরুণ প্রতিভাদের সমন্বয়ে গঠিত এই দলটি নিয়ে কিউই সমর্থকরা নতুন স্বপ্ন দেখছেন।

স্কোয়াডের অভিজ্ঞতার ভিত্তি

ঘোষিত স্কোয়াডের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ড ক্রিস উডকে অধিনায়ক হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলার অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ উড সাম্প্রতিক সময়ে ইনজুরির কারণে কিছুটা মাঠের বাইরে থাকলেও, টিম ম্যানেজমেন্ট তার নেতৃত্ব এবং অভিজ্ঞতার ওপর পূর্ণ আস্থা রেখেছে।

অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার মাধ্যমে উড এখন নিউজিল্যান্ড ফুটবলের কিংবদন্তি অধিনায়ক স্টিভ সামনার (১৯৮২ বিশ্বকাপ) এবং রায়ান নেলসেনের (২০১০ বিশ্বকাপ) পাশে নিজের নাম লিখিয়েছেন। এছাড়া ৩৬ বছর বয়সী অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার টমি স্মিথ এই স্কোয়াডে জায়গা করে নিয়েছেন। ক্রিস উড এবং টমি স্মিথ—এই দুজনই নিউজিল্যান্ডের ফুটবল ইতিহাসে প্রথম পুরুষ খেলোয়াড় হিসেবে দুটি ভিন্ন বিশ্বকাপে (২০১০ ও ২০২৬) দেশের প্রতিনিধিত্ব করার বিরল কীর্তি গড়তে যাচ্ছেন।

দল গঠন ও কোচের ভাবনা

প্রধান কোচ ড্যারেন বেজলি জানিয়েছেন, বিশ্বকাপের চূড়ান্ত দল নির্বাচন করা ছিল একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। গত কয়েক বছরে তিনি এবং তার কোচিং স্টাফ প্রায় ৫৫ জন ফুটবলারকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছিলেন। সেখান থেকে বর্তমান ফর্ম এবং কৌশলগত প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে সেরা ২৬ জনকে বেছে নেওয়া হয়েছে। বেজলির মতে, বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে দেশের হয়ে খেলা যেকোনো ফুটবলারের জন্য সর্বোচ্চ সম্মানের। তিনি স্কোয়াডে অভিজ্ঞদের পাশাপাশি বেশ কিছু নতুন মুখ যুক্ত করেছেন, যাতে দলের ভারসাম্য বজায় থাকে।

প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপট ও গ্রুপ বিন্যাস

ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে বর্তমানে ৮৫তম স্থানে থাকা নিউজিল্যান্ডকে এবার বেশ কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। ড্র অনুযায়ী তারা খেলবে গ্রুপ ‘জি’-তে। এই গ্রুপে তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে রয়েছে শক্তিশালী বেলজিয়াম, মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরান এবং আফ্রিকার অন্যতম শক্তি মিশর। এর আগে নিউজিল্যান্ড ১৯৮২ এবং ২০১০ সালের বিশ্বকাপে অংশ নিলেও কোনোবারই গ্রুপ পর্বের বাধা টপকাতে পারেনি। তবে ২০১০ বিশ্বকাপে তারা গ্রুপ পর্বে তিন ম্যাচের সবকটিতে ড্র করে অপরাজিত থেকে বিদায় নিয়ে ফুটবল বিশ্বে চমক সৃষ্টি করেছিল।

নিউজিল্যান্ডের ২৬ সদস্যের বিশ্বকাপ স্কোয়াড

নিচে আসন্ন বিশ্বকাপের জন্য নিউজিল্যান্ডের ২৬ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ দল বিভাগ অনুযায়ী উপস্থাপন করা হলো:

পজিশনখেলোয়াড়দের নাম
গোলকিপারম্যাক্স ক্রোকম্বে, অ্যালেক্স পলসেন, মাইকেল উড।
ডিফেন্ডারটিম পেইন, ফ্রান্সিস ডি ভ্রিস, টাইলার বিন্ডন, মাইকেল বক্সাল, লিবারাতো কাকাস, নান্দো পিজনেকার, ফিন সুরম্যান, ক্যালান এলিয়ট, টমি স্মিথ।
মিডফিল্ডারজো বেল, ম্যাট গারবেট, মার্কো স্টামেনিক, সরপ্রীত সিং, অ্যালেক্স রুফার, রায়ান টমাস।
ফরোয়ার্ডক্রিস উড (অধিনায়ক), এলি জাস্ট, কোস্টা বারবারুসেস, বেন ওয়েন, বেন ওল্ড, ক্যালাম ম্যাককাউয়াট, জেসি র্যান্ডাল, লাচলান বেলিস।

ঐতিহাসিক পরিসংখ্যান একনজরে

নিউজিল্যান্ডের ফুটবল ইতিহাসে বিশ্বকাপের সফরগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দলটি বড় দলগুলোর বিপক্ষে লড়াকু মানসিকতার পরিচয় দিয়েছে। ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ড তাদের তিনটি ম্যাচেই পরাজিত হয়েছিল। কিন্তু ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে তারা ইতালি, প্যারাগুয়ে এবং স্লোভাকিয়ার মতো দলের বিপক্ষে ড্র করে বিশ্বকে অবাক করে দিয়েছিল। মজার ব্যাপার হলো, সেই আসরে চ্যাম্পিয়ন স্পেনের চেয়েও নিউজিল্যান্ডের একটি বিশেষ রেকর্ড ছিল—তারা আসর শেষ করেছিল একমাত্র অপরাজিত দল হিসেবে (যদিও তারা নকআউট পর্বে যেতে পারেনি)।

বর্তমান স্কোয়াডে ইউরোপীয় এবং আমেরিকান লিগে খেলা ফুটবলারদের আধিক্য থাকায় কোচ বেজলি আশাবাদী যে, ১৬ বছর পর ফিরে এসে দলটি এবার অন্তত নকআউট পর্বে জায়গা করে নিয়ে নতুন ইতিহাস গড়বে। দলের প্রধান তারকা ক্রিস উডের গোল করার দক্ষতা এবং লিবারাতো কাকাস কিংবা জো বেলের মতো তরুণদের গতিশীল ফুটবলই হবে নিউজিল্যান্ডের প্রধান অস্ত্র। ওশেনিয়া অঞ্চলের প্রতিনিধি হিসেবে নিউজিল্যান্ড এখন প্রস্তুত বিশ্বমঞ্চে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিতে।