হাম ও উপসর্গে ৮৯ দিনে ৬৪৩ শিশুর মৃত্যু

গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে হাম এবং হামের উপসর্গ নিয়ে আরও একজন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে ১২ জুন পর্যন্ত মোট ৮৯ দিনে দেশজুড়ে হাম ও হামের উপসর্গে সর্বমোট ৬৪৩ জন শিশুর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। আজ শুক্রবার (১২ জুন) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জারি করা এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। এই পরিসংখ্যানটি মূলত গত বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে আজ শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত সময়কালের মধ্যকার মাঠপর্যায়ের তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে।

প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, সামগ্রিক মৃত্যুর সংখ্যার মধ্যে একটি বড় অংশই মারা গেছে রোগটির প্রাথমিক উপসর্গ নিয়ে। অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এই সময়কালের মধ্যে সন্দেহজনক হামের কারণে মোট ৫৫১ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে, ল্যাবরেটরি পরীক্ষা এবং চিকিৎসকদের দ্বারা নিশ্চিতভাবে হাম আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে আরও ৯২ জন শিশু।

২৪ ঘণ্টার হাসপাতাল ও রোগী ভর্তির পরিসংখ্যান

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গত ২৪ ঘণ্টায় (বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা) সারা দেশে নতুন করে আরও ১ হাজার ১৫৩ জন শিশুর শরীরে হামের বিভিন্ন তীব্র উপসর্গ দেখা গেছে। এই একই সময়ের মধ্যে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে হামের উপসর্গ বা সন্দেহভাজন হাম নিয়ে নতুন করে আরও ১ হাজার ২৭ জন রোগী চিকিৎসার জন্য ভর্তি হয়েছেন।

can অন্যদিকে, গত এক দিনে ল্যাবরেটরি টেস্ট এবং ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত রোগী হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন আরও ১২৪ জন। মাঠপর্যায়ের চিকিৎসকদের মতে, হঠাৎ করে রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের hospital গুলোর সাধারণ এবং শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসা সক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। চিকিৎসকেরা আগত শিশুদের যথাযথ চিকিৎসা সেবা প্রদানের পাশাপাশি আইসোলেশন নিশ্চিত করার ওপর জোর দিচ্ছেন।

৮৯ দিনের সামগ্রিক সংক্রমণ ও সুস্থতার চিত্র

গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু করে ১২ জুন পর্যন্ত সময়কালের সংগৃহীত তথ্য উপাত্ত পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দেশে সামগ্রিক সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ৮৯ দিনে দেশে মোট সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৪ হাজার ২৬৬ জনে। এর পাশাপাশি, একই সময়ের মধ্যে সরকারিভাবে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার মাধ্যমে মোট নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ১৮৫ জনে।

হাসপাতালে ভর্তি এবং সুস্থতার হার বিবেচনায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে যে, ১৫ মার্চ থেকে ১২ জুন পর্যন্ত সময়কালে তীব্র উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে ভর্তি হয়েছে মোট ৬৮ হাজার ৯৩৪ জন শিশু। তবে একই সময়ের মধ্যে হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে সম্পূর্ণ ছাড়পত্র (ডিসচার্জ) পেয়ে বাড়ি ফিরে গেছে ৬৫ হাজার ২৭৫ জন শিশু। বর্তমানে অবশিষ্ট রোগীরা দেশের বিভিন্ন বিশেষায়িত এবং সাধারণ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।

চিকিৎসাবিজ্ঞান ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রেক্ষাপট

হাম বা ‘মিজলস’ একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে এবং তীব্র ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ, যা মূলত প্যারামিক্সোভাইরাস পরিবারের একটি ভাইরাসের কারণে ঘটে থাকে। এটি সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি, কাশি এবং লালারসের মাধ্যমে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং বাতাসে ও সংক্রমিত পৃষ্ঠতলে এই ভাইরাসটি কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে। এই রোগের প্রাথমিক লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে তীব্র জ্বর, অনিয়মিত কাশি, সর্দি, চোখ লাল হওয়া বা চোখ দিয়ে জল পড়া এবং পরবর্তীতে সারা শরীরে সুনির্দিষ্ট লালচে দানা বা র‍্যাশ দেখা দেওয়া। শিশুদের ক্ষেত্রে এই রোগটি নিউমোনিয়া, মারাত্মক ডায়রিয়া, অপুষ্টি এবং মস্তিষ্কের প্রদাহের (এনসেফালাইটিস) মতো মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে, যা সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেলে মৃত্যুর অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দেশব্যাপী সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই)-এর মাধ্যমে শিশুদের হাম ও রুবেলা (এমআর) প্রতিরোধে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। সাধারণত শিশুদের ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ এমআর টিকা প্রদান করা হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীরা আক্রান্ত এলাকাগুলোতে নজরদারি জোরদার করেছেন এবং সাধারণ জনগণকে শিশুদের দ্রুত নিকটস্থ টিকাদান কেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে টিকা নিশ্চিত করার পরামর্শ দিচ্ছেন। রোগের লক্ষণ প্রকাশ পাওয়া মাত্রই শিশুকে অন্য শিশুদের থেকে আলাদা রাখা এবং দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া এই সংক্রমণ রোধের অন্যতম উপায়।