হরমুজ সংকটে জ্বালানি দাম বৃদ্ধি

ইরানে চলমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় গভীর চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বাজারে, যেখানে পেট্রোল ও গ্যাসোলিনের দাম আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠেছে। ফলে ভোক্তা ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে দেশটির সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নতুন চাপ সৃষ্টি হচ্ছে বলে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন গ্যাসোলিনের গড় দাম প্রায় চার দশমিক আঠারো ডলার, যা গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর আগে সর্বশেষ বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি দেখা গিয়েছিল ২০২২ সালের শুরুতে, যখন রাশিয়া–ইউক্রেন সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়। সেই সময় দাম চার ডলারের ওপরে উঠে গিয়ে সর্বোচ্চ প্রায় চার দশমিক পনেরো ডলারে পৌঁছেছিল।

এক বছর আগের পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করলে বর্তমান চিত্র আরও উদ্বেগজনক। তখন গ্যাসোলিনের গড় দাম ছিল প্রায় তিন দশমিক পনেরো ডলার, যা বর্তমান দামের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে জ্বালানি ব্যয় ভোক্তা পর্যায়ে স্পষ্টভাবে বেড়ে গেছে, যা দৈনন্দিন জীবনযাত্রার খরচে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে জ্বালানির দামে বড় ধরনের তারতম্য দেখা যাচ্ছে। উৎপাদন ও পরিশোধন সুবিধা থাকা অঞ্চলে দাম তুলনামূলক কম হলেও পরিবহন ব্যয়, সরবরাহ ঘাটতি এবং আঞ্চলিক নীতিগত পার্থক্যের কারণে কিছু রাজ্যে দাম অনেক বেশি।

যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অঙ্গরাজ্যে জ্বালানি দামের তুলনা

অঙ্গরাজ্যপ্রতি গ্যালন গড় দাম (ডলার)
টেক্সাস৩ দশমিক ৭৮
ক্যালিফোর্নিয়া৫ দশমিক ৯৬
জাতীয় গড়৪ দশমিক ১৮

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান রাজনৈতিক উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী, যা বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রুট, সেখানে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

বিশ্বের মোট জ্বালানি বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেও তা দ্রুত বৈশ্বিক বাজারে প্রভাব ফেলে এবং দাম বৃদ্ধির প্রবণতা তৈরি করে।

সংঘাত শুরুর আগে এই প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন গড়ে একশ বিশ থেকে একশ চল্লিশটি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করত। তবে বর্তমান নিরাপত্তা উদ্বেগ ও ঝুঁকি বৃদ্ধির কারণে এই সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে প্রতিদিন মাত্র আট থেকে দশটিতে নেমে এসেছে। এই হ্রাস সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে আরও সংকট দেখা দিতে পারে এবং দাম আরও বাড়তে পারে। এর ফলে শুধু জ্বালানি নয়, পরিবহন খরচ বৃদ্ধির কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ভোক্তা পর্যায়ে এর চাপ অব্যাহত থাকলে অর্থনৈতিক অস্থিরতা আরও গভীর হতে পারে বলে তারা মনে করছেন।