খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ই জুন ২০২৬, ৪:৩৮ পিএম

সুন্দরবনে কোস্টগার্ডের সঙ্গে কথিত বনদস্যু ‘দুলাভাই বাহিনী’র গোলাগুলির ঘটনায় হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও অস্ত্র আইনে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় বাহিনীটির প্রধান হিসেবে পরিচিত রবিউল ইসলাম, সদস্য ইসরাফিল হাওলাদার এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় রবিউল ইসলাম ও ইসরাফিল হাওলাদারকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
শনিবার সকালে বিষয়টি নিশ্চিত করেন কয়রা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহ আলম। তিনি জানান, কোস্টগার্ডের পেটি অফিসার আরিফুল ইসলামের করা এজাহারের ভিত্তিতে দুটি মামলা গ্রহণ করা হয়েছে। একটি মামলায় হত্যা, হত্যাচেষ্টা, সরকারি কাজে বাধা প্রদান, সরকারি সম্পত্তির ক্ষতিসাধনসহ দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। অন্য মামলাটি করা হয়েছে অস্ত্র আইনে। মামলার অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
পুলিশ ও কোস্টগার্ড সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে কয়রা উপজেলার তেঁতুলতলার চরসংলগ্ন আড়ুয়াশিবসা নদীর পাশের সুন্দরবনের বেশোখাল এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। কোস্টগার্ডের দাবি, তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে বনদস্যুরা অতর্কিতে গুলি চালায়। আত্মরক্ষার্থে কোস্টগার্ড সদস্যরাও পাল্টা গুলি ছোড়েন। টানা গোলাগুলি চলে শুক্রবার ভোর পর্যন্ত।
অভিযান শেষে ঘটনাস্থল থেকে একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই সঙ্গে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় রবিউল ইসলামসহ তিনজনকে উদ্ধার করার দাবি করেছে কোস্টগার্ড। পরে সেখান থেকে ৬টি একনলা বন্দুক, ৬৯টি তাজা কার্তুজ, ৩টি খালি কার্তুজ, একটি দা, একটি বাটন মোবাইল ফোন এবং একটি হাতঘড়িসহ বিভিন্ন আলামত জব্দ করা হয়।
হাসপাতাল ও পুলিশ সূত্র জানায়, শুক্রবার সকালে সাকাত সরদার (৬৪) নামে একজনের মরদেহ এবং গুলিবিদ্ধ রবিউল ইসলামকে কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসে কোস্টগার্ড। প্রাথমিক চিকিৎসার পর রবিউল ইসলামকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। একই দিন দুপুরে সুন্দরবনসংলগ্ন বাবুরাবাদ এলাকা থেকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় দুলাভাই বাহিনীর সদস্য ইসরাফিল হাওলাদারকে আটক করে পুলিশ। বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা রেজাউল করিম জানান, কোস্টগার্ড হাসপাতালে যে দুজনকে নিয়ে আসে, তাদের মধ্যে একজনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। অপরজনকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনায় পাঠানো হয়। পরে পুলিশ আরও একজন গুলিবিদ্ধ ব্যক্তিকে হাসপাতালে ভর্তি করে।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভর্তি নথি অনুযায়ী, শুক্রবার সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটে রবিউল ইসলামকে ‘গানশট ইনজুরি’ নিয়ে ভর্তি করা হয়। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, তিনিই বর্তমানে ‘দুলাভাই বাহিনী’র নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এলাকাবাসীর দাবি, একসময় সুন্দরবনে ‘ইলিয়াস বাহিনী’ সক্রিয় ছিল। ইলিয়াস নিহত হওয়ার পর ২০২৪ সালে তাঁর বোনের স্বামী রবিউল ইসলাম নতুন একটি দল গঠন করেন। পরে সেটিই স্থানীয়ভাবে ‘দুলাভাই বাহিনী’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
নিহত সাকাত সরদারের মেয়ে মরিয়ম খাতুন দাবি করেছেন, তাঁর বাবা পেশায় একজন জেলে ছিলেন। কয়েক দিন আগে বনদস্যুরা তাঁকে মুক্তিপণের দাবিতে অপহরণ করে। এরপর থেকে পরিবারের সদস্যরা তাঁর ফিরে আসার অপেক্ষায় ছিলেন। গোলাগুলির ঘটনার পর তাঁর মরদেহ উদ্ধার হওয়ায় পরিবার শোকাহত।
তবে ঘটনাটি নিয়ে একটি প্রশ্নও সামনে এসেছে। বর্তমানে সুন্দরবনে মাছের প্রজনন মৌসুম চলায় বনাঞ্চলে মাছ ধরা নিষিদ্ধ রয়েছে। এ অবস্থায় সাকাত সরদার কীভাবে ওই এলাকায় ছিলেন, তা নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। পরিবারের দাবি, তিনি স্বেচ্ছায় সেখানে যাননি; অপহরণের পর কয়েক দিন ধরে বনদস্যুদের জিম্মিতে ছিলেন।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, গোলাগুলিতে কোস্টগার্ডের দুই সদস্য আহত হন এবং বাহিনীর একটি স্পিডবোট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে প্রায় পাঁচ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। আত্মরক্ষার্থে কোস্টগার্ড সদস্যরা মোট ২১৬ রাউন্ড গুলি এবং একটি ব্ল্যাংক কার্তুজ নিক্ষেপ করেন বলেও এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।
এদিকে অভিযানের পর সুন্দরবনের ওই এলাকায় পরিস্থিতি বর্তমানে স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানিয়েছেন সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান। তাঁর ভাষ্য, বন বিভাগের তিনটি টহল দল এলাকায় নিয়মিত নজরদারি করছে। পাশাপাশি কোস্টগার্ডের সঙ্গে সমন্বয় রেখে বনাঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ নদী ও খালঘেরা দুর্গম এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন সময়ে বনদস্যু চক্রের তৎপরতার অভিযোগ উঠে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে অনেক চক্র দুর্বল হয়ে পড়লেও বিচ্ছিন্নভাবে কিছু সশস্ত্র দলের সক্রিয়তার অভিযোগ এখনো রয়েছে। সর্বশেষ এই অভিযানকে কেন্দ্র করে নতুন করে বনাঞ্চলের নিরাপত্তা, জেলে ও বনজীবীদের সুরক্ষা এবং বনদস্যু দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
মন্তব্য