সুদূর কানাডায় রবীন্দ্র ও নজরুলজয়ন্তীর বর্ণিল মেলবন্ধন

বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সংগীত জগতের দুই ধ্রুবতারা হলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁদের কালজয়ী সাহিত্যকর্ম ও দর্শনের মেলবন্ধনে সুদূর উত্তর আমেরিকার দেশ কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়া প্রদেশের ভাঙ্কুভারে এক অনবদ্য ‘রবীন্দ্র-নজরুলজয়ন্তী’ উদযাপিত হয়েছে। গত ১৬ মে বিকেল সাড়ে পাঁচটায় স্থানীয় সারে আর্টস সেন্টারে ‘প্রবাস বাংলা কালচারাল সোসাইটি’র উদ্যোগে সুর, বাণী ও নৃত্যের এক অপূর্ব মিলনমেলা অনুষ্ঠিত হয়।

আয়োজক সংগঠনের আদর্শ ও পরিচালনা পর্ষদ

অনুষ্ঠানের মূল উদ্যোক্তা ‘প্রবাস বাংলা কালচারাল সোসাইটি’ ২০০৪ সাল থেকে সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক ও ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে প্রবাসে কাজ করে যাচ্ছে। সংগঠনটি কবিপক্ষ, বাংলা নববর্ষ, মঞ্চনাটক ও সংগীতসন্ধ্যার মতো নানা উৎসবের মধ্য দিয়ে কানাডায় প্রবাসী বাঙালি সমাজের মাঝে শুদ্ধ দেশীয় সংস্কৃতির ধারাকে লালন ও বিকাশ করে আসছে।

উৎসবের সফল বাস্তবায়নে নিয়োজিত পরিচালনা পর্ষদ ও নেপথ্যের কারিগরদের সংক্ষিপ্ত তালিকা নিচে একটি সারণির মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:

পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনামূলক দায়িত্বদায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গের বিবরণ
পরিচালনা পর্ষদের পরিচালকবৃন্দঅনন্যা শীলা শামসউদ্দিন, লুবনা আলম, তানিয়া ঘোষ, মিকণ দাস, শ্রীপর্ণা গুহঠাকুরতা, মাইকেল মিত্র ও শামীম হারুন।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সঞ্চালনাশ্রীপর্ণা গুহঠাকুরতা
সংগীত পরিচালনা ও যন্ত্রসংগীতশুভময় দাসগুপ্ত এবং তাপস বিশ্বাস (তবলা ও কাহন), জগজিৎ সোহার (কি-বোর্ড), সৈকত দাস (গিটার)।
মঞ্চ ও আলোকসজ্জা ব্যবস্থাপনাশামীম হারুন (মঞ্চসজ্জা), আশিক বারি (শব্দ ও আলো), মিশেল মিত্র (গৃহস্থালি)।
আলোকচিত্র ধারণअभिषेक কর্মকার ও ডেরেক বাড়ৈ
স্বেচ্ছাসেবক দলতাহমিদুল বারি, ডমিনিক প্রান্ত ও উইলিয়াম ব্যানার্জি

উদ্বোধনী পর্ব ও সুর-নৃত্যের মায়াবী কোলাজ

অনুষ্ঠানের শুরুতেই দুই বিশ্বকবির জীবন ও সৃষ্টিদর্শনভিত্তিক একটি অত্যন্ত তথ্যবহুল ও চমৎকার আলোচনা উপস্থাপন করেন বিপুল কামাল। মঞ্চটি সাজানো হয়েছিল চমৎকার আলো-ছায়ার আবহে দুই কবির প্রতিকৃতি সংবলিত পোস্টার ও ব্যানারে। সমবেত কণ্ঠে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘শুভ্র সমুজ্জ্বল’ উদ্বোধনী সংগীতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের মূল পর্ব শুরু হয়। এই গানে সমাজে বিদ্যমান অন্যায়, অসত্য ও বৈষম্য দূর করে সত্যের আলো ছড়ানোর যে শাশ্বত আহ্বান ছিল, তা পুরো আয়োজনেই মূর্ত হয়ে ওঠে।

পরবর্তীতে সুশ্বেতার সুমিষ্ট কণ্ঠে রবীন্দ্রসংগীত ‘তোমার কাছে এ বর মাগি’ পরিবেশিত হয়। এর পরপরই সংগঠনের শিশু ও কিশোর শিল্পীরা নজরুলগীতি ‘শুকনো পাতার নূপুর পায়ে’ গানের সাথে চমৎকার চঞ্চল নৃত্যের মাধ্যমে বসন্তের রূপ ফুটিয়ে তোলে। ঋতু বন্দনার ধারাবাহিকতায় ঐশী ও নবমিতার যৌথ যুগল নৃত্যে ‘মন মোর মেঘের সঙ্গী’ ও ‘নীল অঞ্জন ঘন কুঞ্জ ছায়ায়’ গানের সাথে বর্ষার মায়াবী রূপ প্রকাশিত হয়। এরপর কিশোর নীলভ ও মোহর রবীন্দ্রসংগীত ‘আলো আমার আলো’ পরিবেশন করে দর্শকাসনে এক ঐশ্বরিক আবহ তৈরি করে।

একক, দ্বৈত ও মিশ্র সুরের অনন্য পরিবেশনা

অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে একক ও দ্বৈত পরিবেশনায় নৃত্য ও সংগীতের এক অপূর্ব রূপ দেখা যায়। লুবনা আলম তাঁর চমৎকার গায়কিতে নজরুলগীতি ‘মধুর নূপুর বাজে’ পরিবেশন করেন। এরপর শম্পার আকর্ষণীয় কবিতাপাঠ উপস্থিত দর্শকদের মুগ্ধ করে। সুদীপ ও লালনার দ্বৈত কণ্ঠে ‘মঞ্জরী ও মঞ্জরী আমের মঞ্জরী’ এবং ‘আজি এ সন্ধ্যা’ গানে বসন্তের আগমনী বার্তা ও সন্ধ্যার স্নিগ্ধতা ফুটে ওঠে। শুভজিৎ ও মানন্যা পরিবেশন করেন রবীন্দ্রসংগীত ‘তোমার খোলা হাওয়া’।

ভক্তি ও প্রেমের মেলবন্ধনে তানিয়া ও সৈকতের যৌথ কণ্ঠে নজরুলগীতি ‘দাঁড়ায়ে দুয়ারে’ গানটি শ্রোতাদের হৃদয় স্পর্শ করে। এরপর ইরা তাঁর সুনিপুণ নৃত্যভঙ্গিমায় ‘শ্যাম সুন্দর গিরিধারী’ গানের সাথে শ্রীকৃষ্ণের প্রতি ভক্তের নিবেদন প্রকাশ করেন। অনন্যা শীলার কণ্ঠে ‘সখী সাজায়ে দে’ এবং হ্যাপির গায়কিতে ‘আমার নিশীথ রাতের বাদল ধারা’ গান দুটি দর্শকদের ক্ষণিকের জন্য বর্ষার গভীরতায় নিয়ে যায়। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় কৃষ্ণের জন্য রাধার ব্যাকুলতাকে সৈকত তাঁর মাধুর্যময় কণ্ঠ ও বাঁশির সুরে ফুটিয়ে তোলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৈথিলী ও ব্রজবুলি ভাষার সংমিশ্রণে সৃষ্ট ‘শাওন গগনে’ গানটি পরিবেশন করে তিনি অনুষ্ঠানকে ধ্রুপদি ধারার এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। এর সাথে বৈচিত্র্য যোগ করতে মাইকেল মিত্র ও তানিয়া পরিবেশন করেন রবীন্দ্রসংগীতের চমৎকার মিশ্রণ বা ফিউশন—যেখানে স্থান পায় ‘তোমার হলো শুরু আমার হলো সারা’, ‘মন মোর মেঘের সঙ্গী উড়ে চলে’, ‘তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী’ এবং ‘যদি তারে নাই চিনি গো সে কি আমায় নেবে চিনে’ গানগুলো।

সমাপনী ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ

বর্তমান বিশ্বের অস্থিরতা ও সংকটের মধ্যে শান্তি ও মানবতার পরম বার্তা ছড়িয়ে দিতে সমবেত কণ্ঠে ‘হিংসায় উন্মত্ত পৃথিবী’ গানটি পরিবেশনের মধ্য দিয়ে সুর, বাণী ও নৃত্যের এই অপূর্ব আয়োজন সমাপ্ত হয়। অনুষ্ঠান শেষে শিল্পী, পৃষ্ঠপোষক এবং উপস্থিত দর্শকদের ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন সৈকত ঘোষাল ও মাইকেল মিত্র।

মূল শিল্পীদলের মধ্যে ছিলেন সুশ্বেতা ব্যানার্জি, হ্যাপি দাস, সুদীপ মুখার্জি, অনন্যা শীলা, রঞ্জনা মুখার্জি, লুবনা আলম, তানিয়া ঘোষ ও মাইকেল মিত্র। আয়োজনের শিশু-কিশোর শিল্পীরা হলো শুভজিৎ দাস, শুদ্ধ কম দাস, মানন্যা চক্রবর্তী ও মোহর। এ অনুষ্ঠানে বিশেষ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা হয় বিষ্ণু গোপাল চ্যাটার্জি, সারে সিটি কালচারাল অনুদান, লাইক জাইসি বা মাহিন সরকার পরিবার, জহির উদ্দিন, তারিক মালিক, আজাদ শেখ ও রবীণ মহলকে। এ ছাড়া বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা হয় বাংলাদেশ কমিউনিটির উপস্থিত শ্রোতা-দর্শক এবং সারে আর্টস সেন্টার স্টুডিও থিয়েটারের কর্মীদের প্রতি।