খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ই জুন ২০২৬, ১:৯ এএম

দেশের বেসরকারি খাতে এক ধরনের স্থবিরতা নেমে এসেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণের চড়া সুদ এবং জ্বালানি সংকটের ত্রিমুখী চাপে নতুন করে বিনিয়োগ করার সাহস পাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে অর্থনীতিতে বড় ধরনের মন্দা দেখা দিতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদেরা। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর কাকরাইলে দ্য ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি) মিলনায়তনে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এসব কথা উঠে আসে। আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে এই বিশেষ সভার আয়োজন করা হয়।
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। অর্থনীতি সমিতির অন্তর্বর্তীকালীন কমিটির আহ্বায়ক মাহবুব উল্লাহর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সমিতির সদস্যসচিব মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। সভায় দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদেরা বর্তমান অর্থনীতির নানামুখী চ্যালেঞ্জ নিয়ে মোট সাতটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
বক্তারা বলেন, নতুন করে বন্ধ কারখানা চালু করার জন্য বাজেটে প্রণোদনা তহবিলের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন চালু থাকা বিদ্যমান শিল্পকারখানাগুলোকে টিকিয়ে রাখা। কারণ, গত কয়েক প্রান্তিকে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। এত উচ্চ কর এবং ডাবল ডিজিটের সুদ দিয়ে কোনো দেশেই সুস্থ ব্যবসা পরিচালনা করা সম্ভব নয়। তাই অর্থনীতিকে সচল করতে অবিলম্বে নীতি সুদহার কমানোর পাশাপাশি করের টাকার অপচয় পুরোপুরি বন্ধের তাগিদ দেন তাঁরা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “আমরা দেশের দীর্ঘদিনের প্রচলিত বাজেটের মডেলটাকে পুরোপুরি পরিবর্তন করার চেষ্টা করছি। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ। যাতে দেশের নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠী নয়, বরং সব স্তরের মানুষ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার সমান সুযোগ পায়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে অতীতে এটি একটি বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতার অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছিল। একটি বিশেষ গোষ্ঠী সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করত এবং তারা অত্যন্ত ক্ষমতাধর ছিল। আমরা বর্তমান বাজেটের মাধ্যমে সেই বৃত্ত থেকে বের হয়ে আসার একটি সৎ চেষ্টা করছি।”
সভায় রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ সংস্থা ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান আবু আহমেদ বেসরকারি খাতের দুরাবস্থা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আগামী অর্থবছরের জন্য সাড়ে ৬ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা কেবল সরকারের একা পক্ষে পূরণ করা অসম্ভব। এর জন্য বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসতে হবে। অথচ প্রতিবেশী দেশ ভারতে যেখানে নীতি সুদহার সাড়ে ৬ শতাংশের কাছাকাছি, সেখানে বাংলাদেশে এটি ১০ শতাংশ ছুঁইছুঁই। ফলে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। বিনিয়োগ বাড়াতে হলে সবার জন্য ঋণের সুদের হার অবিলম্বে কমিয়ে আনতে হবে।” অন্যদিকে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নুরুল আমিন বলেন, বাজেটে আমানতকারীদের সুরক্ষার যে কথা বলা হয়েছে তা ভালো, তবে ব্যাংক খাতের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় কাজ।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বিসিআই-এর সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী শিল্প খাতের সংকট নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছাড়া কোনোভাবেই বেসরকারি খাতে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি আসবে না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতার সমালোচনা করে তিনি বলেন, সেখানে চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে। রাজস্ব আদায়ের নামে ব্যবসায়ীদের হয়রানি বন্ধ করতে এনবিআরে আমূল সংস্কার প্রয়োজন।
গবেষণাপ্রতিষ্ঠান র্যাপিডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক বলেন, সরকার একই সাথে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, স্থিতিশীলতা ও পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে, যা অত্যন্ত জটিল। অর্থনীতিকে আগে পুরোপুরি স্থিতিশীল করতে হবে, অন্যথায় মূল্যস্ফীতি আবার নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়তে পারে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শরমিন্দ নীলোর্মি ফ্যামিলি কার্ডে নারীকে খানা প্রধানের স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগকে স্বাগত জানান, তবে বরাদ্দের পরিমাণ বাড়ানোর ওপর জোর দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক সায়মা হক শিক্ষা খাতের মান উন্নয়ন, যুব বেকারত্ব দূরীকরণ ও নারীদের কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা কাটানোর জন্য বাজেটে সুনির্দিষ্ট প্রকল্প রাখার দাবি জানান। সভায় আরও বক্তব্য দেন বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক মোহাম্মদ ইউনূস, কাজী ইকবাল এবং বুয়েটের শিক্ষক নাজমুল ইসলাম। সব মিলিয়ে বক্তারা একমত হন যে, সামষ্টিক অর্থনীতির সংস্কার ছাড়া বেসরকারি খাতে প্রাণ ফেরানো সম্ভব নয়।
মন্তব্য