সীতাকুণ্ডে প্রাইভেটকারের গ্যাস সিলিন্ডারে সাড়ে ৩ কোটির ইয়াবা

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে মাদক পাচারের একটি বড় ধরনের অভিনব কৌশল নস্যাৎ করেছে পুলিশ প্রশাসন। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় জব্দ করা একটি প্রাইভেটকারের গ্যাস সিলিন্ডারের ভেতর থেকে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত মাদকের মোট সংখ্যা ১ লাখ ২৪ হাজার পিস, যার আনুমানিক বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা। তবে পুলিশের অভিযানের সময় কৌশলে পালিয়ে যাওয়ার কারণে এই মাদক চোরাচালান ও পাচারের ঘটনার সাথে জড়িত কোনো অপরাধী বা কারবারিকে হাতেনাতে আটক করা সম্ভব হয়নি।

গোপন সংবাদ ও মহাসড়কে পুলিশের বিশেষ অভিযান

পুলিশের দায়িত্বশীল সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত সোমবার ভোররাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে সীতাকুণ্ড থানা পুলিশের একটি নিয়মিত টহল দল দায়িত্বরত ছিল। ওই সময় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে police জানতে পারে যে, পর্যটন নগরী কক্সবাজার থেকে রাজধানী ঢাকার উদ্দেশ্যে সুনির্দিষ্ট একটি প্রাইভেটকারে করে নিষিদ্ধ মাদক ইয়াবার একটি অত্যন্ত বড় চালান পাচার করা হচ্ছে। এই সুনির্দিষ্ট এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে সীতাকুণ্ড থানা পুলিশ মহাসড়কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে তাদের নজরদারি ও তল্লাশি কার্যক্রম ব্যাপকভাবে জোরদার করে।

নজরদারি চলাকালীন সময়ে মহাসড়ক দিয়ে দ্রুতগতিতে ধাবমান একটি ঢাকামুখী প্রাইভেটকারের গতিবিধি ও চলাচল দেখে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যদের মনে তীব্র সন্দেহ দানা বাঁধে। গাড়িটির গতি রোধ করার জন্য পুলিশ সেটিকে থামার সংকেত প্রদান করে। তবে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে গাড়ির চালক সংকেত অমান্য করে প্রাইভেটকারটির গতি আরও বাড়িয়ে দিয়ে দ্রুত এলাকা থেকে পালানোর চেষ্টা করেন।

ধাওয়া, গাড়ি জব্দ এবং আসামিদের পলায়ন

প্রাইভেটকারটি সংকেত অমান্য করে দ্রুত বেগে চলে যাওয়ার পর টহল পুলিশ দলও নিজস্ব গাড়ি নিয়ে সেটিকে ধাওয়া করা শুরু করে। পুলিশের তীব্র তাড়া খেয়ে পাচারকারীরা মহাসড়কের বড় দারোগারহাট এলাকায় অবস্থিত ওজন স্কেলের (অ্যাক্সেল লোড কন্ট্রোল স্টেশন) সামনে এসে গাড়িটি থামাতে বাধ্য হয়। তবে পুলিশ গাড়িটির কাছাকাছি পৌঁছানোর পূর্বেই সুযোগ বুঝে প্রাইভেটকারের চালক এবং তার সাথে থাকা মাদক পাচারকারী চক্রের অন্য সদস্যরা গাড়ি থেকে নেমে দ্রুত অন্ধকারে পালিয়ে যায়।

পরবর্তীতে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে কাউকে না পেয়ে প্রাইভেটকারটি পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে এবং আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে গাড়িটি জব্দ করে সীতাকুণ্ড থানায় নিয়ে আসে। থানায় আনার পর প্রাথমিক তল্লাশিতে গাড়ির ভেতর দৃশ্যমান কোনো অবৈধ জিনিসপত্র পাওয়া যায়নি।

গ্যাস সিলিন্ডার পরীক্ষা এবং মাদক উদ্ধার

জব্দকৃত প্রাইভেটকারটি সীতাকুণ্ড থানায় নিয়ে আসার পর পুলিশ সদস্যরা পুনরায় গাড়িটি নিখুঁতভাবে তল্লাশি করতে শুরু করেন। এই পুঙ্খানুপুঙ্খ তল্লাশির একপর্যায়ে গাড়ির পেছনে সংযুক্ত থাকা গ্যাস সিলিন্ডারটির গঠন ও ওজন দেখে কর্তব্যরত পুলিশ কর্মকর্তাদের মনে গভীর সন্দেহ জাগে। বিষয়টি সাধারণ যান্ত্রিক ত্রুটি বা স্বাভাবিক সিলিন্ডার নয় বলে মনে হওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে তা জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিস্তারিতভাবে অবহিত করা হয়।

ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় মঙ্গলবার রাতে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিবি) রাসেলের উপস্থিতিতে থানায় বিশেষ সতর্কতার সাথে সিলিন্ডারটি কাটার ব্যবস্থা করা হয়। সিলিন্ডারের মুখ ও ভেতরের অংশ খোলার পর তার মধ্য থেকে বিশেষ পদ্ধতিতে লুকানো অবস্থায় বায়ুনিরোধক বা এয়ারটাইট মোড়কে সুন্দরভাবে সংরক্ষিত করা ১ লাখ ২৪ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। অত্যন্ত নিখুঁত ও প্রযুক্তিগতভাবে সিলিন্ডারের ভেতরে এই বিপুল পরিমাণ মাদক এমনভাবে স্তরীভূত করা হয়েছিল যা সাধারণ চোখে ধরা পড়ার মতো ছিল না।

আইনি পদক্ষেপ এবং সীতাকুণ্ড থানার ওসির বক্তব্য

এই চাঞ্চল্যকর ও অভিনব মাদক উদ্ধারের ঘটনার সার্বিক অগ্রগতি এবং আইনগত ব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত করেছেন সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মহিনুল ইসলাম।

তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমকে জানান যে, উদ্ধারকৃত ১ লাখ ২৪ হাজার পিস ইয়াবার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা। অভিনব কায়দায় গ্যাস সিলিন্ডারের ভেতরে মাদক লুকিয়ে তা মহাসড়ক দিয়ে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মহিনুল ইসলাম আরও স্পষ্ট করেন যে, পরিত্যক্ত প্রাইভেটকারটি এবং উদ্ধার হওয়া বিপুল পরিমাণ ইয়াবার চালানটি বর্তমানে থানা হেফাজতে রয়েছে। এই মাদক চোরাচালানের ঘটনার সাথে সুনির্দিষ্টভাবে কারা জড়িত রয়েছে এবং এই গাড়িটির প্রকৃত মালিক কে, তা খুঁজে বের করার জন্য পুলিশি অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হয়েছে। পলাতক মাদক কারবারিদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার জন্য জোর তৎপরতা চালানো হচ্ছে এবং এই বিষয়ে দেশের প্রচলিত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে সীতাকুণ্ড থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হচ্ছে।