সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর কারামুক্তি লাভ

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী আদালত থেকে জামিন লাভের পর কারাগার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তি পেয়েছেন। বুধবার (৩ জুন) রাত ১০টা ৮ মিনিটে গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। সরকারের কারাবিধি এবং আদালতের নির্দেশনা অনুসরণ করে সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর কারা কর্তৃপক্ষ তাকে মুক্তি দেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এই ঘটনাটি তার দীর্ঘদিনের আইনি লড়াইয়ের পর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারামহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া) মো. জান্নাত-উল ফরহাদ সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর জামিনে মুক্ত হওয়ার বিষয়টি গণমাধ্যমের কাছে নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, মহিলা হাজতি বন্দি ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর জামিনের আনুষ্ঠানিক আদেশ ৩ জুন কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারে পৌঁছায়। কারা কর্তৃপক্ষ আদালতের আদেশটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করে। অন্য কোনো মামলায় তার বিরুদ্ধে নতুন কোনো আটকাদেশ বা গ্রেফতারি পরোয়ানা সচল না থাকায়, প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া ও নথিপত্র যাচাই শেষে তাকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।

গ্রেফতারের পটভূমি ও প্রথম দফার মামলাসমূহ

ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে গত বছরের ৯ মে ভোরের দিকে নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগ এলাকায় অবস্থিত তার নিজস্ব বাসভবন থেকে পুলিশ গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের পর দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সংঘটিত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময়কার বিভিন্ন ঘটনার জেরে তার বিরুদ্ধে একাধিক আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে তাকে মোট পাঁচটি মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছিল। এর মধ্যে তিনটি ছিল সরাসরি হত্যা মামলা এবং অপর দুটি ছিল হত্যাচেষ্টা মামলা।

এই প্রথম দফার পাঁচ মামলায় গত বছরের ৯ নভেম্বর উচ্চ আদালত তথা হাইকোর্ট বিভাগ সেলিনা হায়াৎ আইভীর জামিন মঞ্জুর করে রায় প্রদান করেন। তবে হাইকোর্টের এই জামিন আদেশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ তীব্র আইনি আপত্তি জানায় এবং আপিল বিভাগে পৃথক পাঁচটি আবেদন দাখিল করে। পরবর্তী সময়ে গত বছরের ১২ নভেম্বর আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত হাইকোর্টের দেওয়া জামিন আদেশটি সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করেন এবং রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনগুলো আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে শুনানির জন্য পাঠানোর নির্দেশ দেন।

এরই ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে পৃথক পাঁচটি লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) দায়ের করে। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও শুনানির পর, গত ১০ মে আপিল বিভাগ রাষ্ট্রপক্ষের দায়ের করা পাঁচটি লিভ টু আপিলই খারিজ করে আদেশ দেন। আপিল বিভাগের এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ফলে প্রথম দফার ওই পাঁচ মামলায় সাবেক মেয়র আইভীর হাইকোর্ট থেকে প্রাপ্ত জামিন বহাল ও কার্যকর থাকে।

দ্বিতীয় দফার মামলা ও আপিল বিভাগের আইনি প্রক্রিয়া

প্রথম দফার পাঁচ মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ জামিন মঞ্জুর করার পরপরই আইনি জটিলতা আরও বৃদ্ধি পায়। গত বছরের নভেম্বর মাসে সেলিনা হায়াৎ আইভীকে আরও নতুন পাঁচটি মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়, যা তার কারামুক্তির পথকে দীর্ঘায়িত করে। দ্বিতীয় দফার এই পাঁচ মামলার মধ্যে চারটি ছিল নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানায় দায়ের করা হত্যা মামলা। অবশিষ্ট মামলাটি ছিল নারায়ণগঞ্জ সদর থানায় দায়ের করা, যার অভিযোগের ভিত্তিতে বলা হয়েছিল যে তিনি হামলা এবং সরকারি কাজে বাধা প্রদানের মতো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

মামলার দফামামলার সংখ্যাসংশ্লিষ্ট থানা ও অভিযোগের প্রকৃতিজামিনের বর্তমান স্থিতি
প্রথম দফা৫টি মামলা৩টি হত্যা ও ২টি হত্যাচেষ্টা মামলাআপিল বিভাগ কর্তৃক জামিন বহাল
দ্বিতীয় দফা৫টি মামলা৪টি ফতুল্লা (হত্যা) ও ১টি সদর থানা (হামলা ও সরকারি কাজে বাধা)স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার ও জামিন বহাল

দ্বিতীয় দফার এই পাঁচ মামলায় গত ২৬ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট বিভাগ জামিন প্রশ্নে রুল জারি করেন এবং একই সঙ্গে আইভীকে ছয় মাসের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন জামিন প্রদান করেন। এই জামিন আদেশের বিরুদ্ধেও রাষ্ট্রপক্ষ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল দায়ের করে। গত ৫ মার্চ আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত শুনানি শেষে হাইকোর্টের দেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন জামিনের ওপর স্থগিতাদেশ জারি করেন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনগুলো নিষ্পত্তির জন্য আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে স্থানান্তরের আদেশ দেওয়া হয়।

পরবর্তী সময়ে, দ্বিতীয় দফার এই পাঁচ মামলায় আইভীকে হাইকোর্টের দেওয়া জামিনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের করা পৃথক লিভ টু আপিলগুলো গত ১০ মে আপিল বিভাগের কার্য তালিকায় শুনানির জন্য ওঠে। সেদিন আপিল বিভাগ এক আদেশে আইভীর জামিনের ওপর চেম্বার আদালতের পূর্বে দেওয়া স্থগিতাদেশটি প্রত্যাহার করে নেন এবং একই সঙ্গে হাইকোর্ট বিভাগকে জামিন প্রশ্নে জারিকৃত রুল দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন। রাষ্ট্রপক্ষের পৃথক পাঁচটি লিভ টু আপিল নিষ্পত্তি করে দেশের সর্বোচ্চ আদালত এই আদেশ প্রদান করেন। এর ফলে দ্বিতীয় দফার পাঁচ মামলাতেও আইভীকে হাইকোর্টের দেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন জামিনটি আইনিভাবে বহাল ও কার্যকর হয়, যা তার কারাগার থেকে মুক্তির পথ সুগম করে।

সেলিনা হায়াৎ আইভীর রাজনৈতিক জীবন

ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় সরকার রাজনীতিতে অত্যন্ত দীর্ঘ এবং সুপরিচিত অধ্যায়ের অধিকারী। তিনি ২০০৩ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত সাবেক নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার প্রথম নারী চেয়ারম্যান এবং পরবর্তী সময়ে মেয়র হিসেবে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।

এরপর ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা, কদমরসুল পৌরসভা ও সিদ্ধিরগঞ্জ পৌরসভাকে একীভূত করে যখন নবগঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) প্রতিষ্ঠা করা হয়, তখন থেকে তিনি এই সংস্থার হাল ধরেন। তিনি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ইতিহাসে টানা তিনটি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ভোটে জয়ী হন এবং মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রাজনৈতিকভাবে তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। গত বছরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পূর্ব পর্যন্ত তিনি নারায়ণগঞ্জ স্থানীয় প্রশাসনের শীর্ষ পদে আসীন ছিলেন।