খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ই মে ২০২৬, ২:৪৮ পিএম

জুলাই মাসে সংঘটিত ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে চট্টগ্রামে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলার আইনি প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ আদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এই মামলায় পলাতক থাকা সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ এবং সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলসহ মোট ১৭ জন আসামির পক্ষে আইনি লড়াই পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আজ বুধবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই আদেশ প্রদান করেন। ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্যানেলে অন্য দুই সদস্য হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
শুনানি চলাকালীন রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর মোহাম্মদ জহিরুল আমিন আদালতকে অবহিত করেন যে, আলোচ্য মামলায় মোট আসামির সংখ্যা ২২ জন। এর মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীসহ মাত্র ৫ জন বর্তমানে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে বা কারাগারে আছেন। অবশিষ্ট ১৭ জন আসামি, যাদের মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী সাবেক দুই মন্ত্রীও রয়েছেন, বর্তমানে পলাতক। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি অনুযায়ী, পলাতক আসামিদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ট্রাইব্যুনালে হাজির হওয়ার জন্য আইনগতভাবে প্রচলিত নিয়ম মেনে সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লিখিত সময়সীমা অতিক্রান্ত হওয়ার পরও আসামিরা আদালতে আত্মসমর্পণ না করায় মামলার কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছিল। এমতাবস্থায় বিচারিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে এবং পলাতক আসামিদের আইনগত অধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে চট্টগ্রামে সংঘটিত পৃথক তিনটি প্রধান অপরাধের ওপর ভিত্তি করে এই মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র তৈরি করা হয়েছে। মামলায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মোট ৬ জনকে হত্যা এবং শতাধিক ব্যক্তিকে গুরুতর জখম করার অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রসিকিউশন কর্তৃক উত্থাপিত অভিযোগের সংক্ষিপ্ত রূপ নিচে তুলে ধরা হলো:
মামলার প্রধান অভিযোগ ও হতাহতের পরিসংখ্যান
| অভিযোগের ক্রম | ঘটনার তারিখ | হতাহতের বিবরণ | প্রধান অভিযোগের ধরন |
| প্রথম অভিযোগ | ১৬ জুলাই ২০২৪ | মো. ওয়াসিম আকরাম, ফয়সাল আহমেদ শান্ত ও মো. ফারুক নিহত | পরিকল্পিত হত্যা ও বলপ্রয়োগ |
| দ্বিতীয় অভিযোগ | ১৮ জুলাই ২০২৪ | তানভীর সিদ্দিকী, মো. সাইমন ও হৃদয় চন্দ্র নিহত | গুলিবর্ষণ ও গণহত্যা সদৃশ অপরাধ |
| তৃতীয় অভিযোগ | জুলাই মাসব্যাপী | শতাধিক সাধারণ মানুষ গুরুতর আহত | মরণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার ও নির্যাতন |
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ৪ জুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন। ওই দিন রাষ্ট্রপক্ষ থেকে দাখিলকৃত আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের ওপর বিস্তারিত শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীরা পলাতক ১৭ আসামির পক্ষে আইনি সুরক্ষা প্রদান করবেন এবং তাঁদের অনুপস্থিতিতে বিচারকার্য সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা দেবেন। নিয়ম অনুযায়ী, যে সকল আসামি পলাতক থাকেন বা নিজেদের পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ করতে অক্ষম, ন্যায়বিচারের স্বার্থে রাষ্ট্র তাঁদের জন্য আইনজীবী নিয়োগ করে থাকে।
চট্টগ্রামের এই আলোচিত মামলাটি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ট্রাইব্যুনালের এই আদেশটি বিচার প্রক্রিয়াকে দীর্ঘসূত্রতা থেকে মুক্ত করার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মামলার উল্লেখযোগ্য পলাতক আসামিদের মধ্যে হাছান মাহমুদ ও মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ছাড়াও চট্টগ্রামের আঞ্চলিক রাজনীতির বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা রয়েছেন বলে জানা গেছে। বিচারিক প্যানেল স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন যে, নির্ধারিত তারিখে অভিযোগ গঠনের শুনানির মাধ্যমে মামলার মূল বিচারিক পর্যায় শুরু হবে। পলাতক থাকা সত্ত্বেও আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সাক্ষ্য গ্রহণ ও দালিলিক প্রমাণ উপস্থাপনের কাজ বিধি মোতাবেক চলমান থাকবে। এই আদেশের ফলে জুলাই-আগস্টের গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়ায় একটি বিশেষ গতিশীলতা আসবে বলে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীগণ ধারণা করছেন।
মন্তব্য