জি- লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ৮ই আগস্ট ২০২৬, ৩:১৩ পিএম

বাংলাদেশে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ক্রমেই ভয়াবহ সড়ক নিরাপত্তা সংকটে পরিণত হচ্ছে। গত সাড়ে ছয় বছরে দেশে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৫ হাজার ৭১২ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে আহত হয়েছেন আরও ১৪ হাজার ১৪৩ জন। নিহত ও আহতদের বড় একটি অংশ কিশোর ও তরুণ। দুর্ঘটনায় আক্রান্তদের অর্ধেকেরও বেশি মানুষের বয়স ১৩ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে হওয়ায় তরুণদের মোটরসাইকেল চালনা ও সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে ১৬ হাজারের বেশি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে। শনিবার প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে দুর্ঘটনার ধরন, দায়ী যানবাহন, সড়কের ধরন এবং দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, চার চাকার অন্যান্য যানবাহনের তুলনায় মোটরসাইকেল প্রায় ৩০ গুণ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তারপরও যানজটপূর্ণ শহর ও মহাসড়কে দ্রুত চলাচল, তুলনামূলক কম খরচ এবং সহজে গন্তব্যে পৌঁছানোর সুবিধার কারণে দেশে মোটরসাইকেলের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। পর্যাপ্ত, সহজলভ্য ও যাত্রীবান্ধব গণপরিবহনের ঘাটতিও ব্যক্তিগত মোটরসাইকেলের ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে।
Table of Contents
দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার ২২ শতাংশ ঘটেছে মুখোমুখি সংঘর্ষে। ৩৪ শতাংশের বেশি দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন। আর ৩৯ শতাংশের বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে ভারী যানবাহনের ধাক্কায়।
মোটরসাইকেল আরোহীদের সুরক্ষা ব্যবস্থাও তুলনামূলকভাবে সীমিত। চার চাকার গাড়ির মতো শক্ত কাঠামো, সিটবেল্ট বা যাত্রীকে ঘিরে রাখার ব্যবস্থা না থাকায় সংঘর্ষের সময় মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী সরাসরি আঘাতের মুখে পড়েন। ফলে দুর্ঘটনা এড়ানোর পাশাপাশি দুর্ঘটনার সময় আঘাতের মাত্রা কমানোর বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ ক্ষেত্রে মানসম্পন্ন হেলমেটের ব্যবহার বড় ভূমিকা রাখতে পারে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে, উপযুক্ত মানের হেলমেট ব্যবহার করলে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঝুঁকি ৪৮ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে অনেক চালক নিম্নমানের হেলমেট ব্যবহার করেন। কেউ হেলমেট পরলেও সেটি সঠিকভাবে মাথায় বাঁধেন না। ফলে দুর্ঘটনার সময় হেলমেটের সুরক্ষা কার্যকারিতা কমে যেতে পারে।
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার জন্য শুধু চালকদের দায়ী করলে দুর্ঘটনার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ৩৬ শতাংশের বেশি দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেল চালক এককভাবে দায়ী ছিলেন। বিপরীতে প্রায় ৪০ শতাংশ দুর্ঘটনার সঙ্গে পণ্যবাহী যানবাহনের সম্পৃক্ততা রয়েছে। বাসচালকদের বেপরোয়া আচরণের সঙ্গে সম্পর্কিত দুর্ঘটনার হার প্রায় সাড়ে ১৩ শতাংশ।
এতে স্পষ্ট হয়, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা অনেক ক্ষেত্রেই একক কোনো চালকের ভুলের ফল নয়। বড় যানবাহনের বেপরোয়া চলাচল, অতিরিক্ত গতি, নিরাপদ দূরত্ব বজায় না রাখা, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং ট্রাফিক আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ না হওয়ার মতো বিষয়ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়।
সড়কের ধরন অনুযায়ীও দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার প্রায় ৩০ শতাংশ ঘটেছে জাতীয় মহাসড়কে। আঞ্চলিক সড়কে ঘটেছে প্রায় ৪২ শতাংশ। গ্রামীণ সড়কে দুর্ঘটনার হার ১২ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলে প্রায় সাড়ে ১৬ শতাংশ।
জাতীয় ও আঞ্চলিক সড়কে সাধারণত দ্রুতগতির বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যানসহ বিভিন্ন ধরনের যান চলাচল করে। একই সড়কে মোটরসাইকেলের সঙ্গে এসব বড় যানবাহনের গতির পার্থক্য বেশি থাকায় ঝুঁকিও বাড়ে। দ্রুতগতিতে ওভারটেকিং, হঠাৎ লেন পরিবর্তন কিংবা বিপরীত দিক থেকে আসা যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষ হলে মোটরসাইকেল আরোহীর গুরুতর আহত বা নিহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত মোট মোটরযানের প্রায় ৭১ শতাংশই মোটরসাইকেল। এর একটি বড় অংশ কিশোর ও তরুণেরা ব্যবহার করছেন। অতিরিক্ত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, ট্রাফিক আইন অমান্য এবং অভিজ্ঞতার ঘাটতি—এসব কারণে তরুণ চালকদের দুর্ঘটনায় পড়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন মোটরসাইকেল উৎপাদন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিজ্ঞাপন নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে। তাদের মতে, বিজ্ঞাপনে গতি ও উচ্চক্ষমতার মোটরসাইকেলকে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপনের ফলে তরুণদের মধ্যে দ্রুতগতির প্রতি আগ্রহ বাড়তে পারে। তাই মোটরসাইকেলের প্রচারে শুধু গতি বা শক্তির প্রদর্শন নয়, নিরাপদ ও দায়িত্বশীল চালনার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরার সুপারিশ করা হয়েছে।
সংগঠনটির বিশ্লেষণে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার জন্য একাধিক কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কিশোর ও তরুণদের বেপরোয়া চালনা, ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বেপরোয়া মোটরসাইকেল ব্যবহারের সংস্কৃতি, দুর্বল আইন প্রয়োগ এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রমের ঘাটতি।
এ ছাড়া ত্রুটিপূর্ণ সড়ক অবকাঠামো, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির সীমাবদ্ধতা, যানজট, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী গণপরিবহনের অভাব এবং নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহারে অনীহাও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুর্ঘটনা কমাতে মানসম্পন্ন হেলমেটের ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের ওপর জোর দিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। অতিরিক্ত গতি, বিপজ্জনক ওভারটেকিং, হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো এবং অন্যান্য গুরুতর নিয়মভঙ্গের বিরুদ্ধে নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছে সংগঠনটি।
শুধু আইন প্রণয়ন করলেই পরিস্থিতির উন্নতি হবে না; মাঠপর্যায়ে তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করাও জরুরি। এ ক্ষেত্রে গতি শনাক্তকরণ ব্যবস্থা, ক্যামেরাভিত্তিক নজরদারি এবং অন্যান্য প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও কিশোর ও তরুণদের জন্য সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে নিয়মিত কর্মসূচি চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিরাপদ মোটরসাইকেল চালনা, হেলমেটের সঠিক ব্যবহার এবং ট্রাফিক আইন মেনে চলার বিষয়ে ধারাবাহিক প্রচারণার প্রয়োজন রয়েছে।
একই সঙ্গে নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো গড়ে তোলা, বড় যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ, মোটরসাইকেলের বিজ্ঞাপনে নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়া এবং সহজ, সাশ্রয়ী ও যাত্রীবান্ধব গণপরিবহন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মোটরসাইকেলের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা বাস্তবসম্মত নয়। যানজট, গণপরিবহনের সীমাবদ্ধতা এবং দ্রুত যাতায়াতের প্রয়োজনের কারণে অনেক মানুষের কাছে এটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন মাধ্যম হয়ে উঠেছে। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত মোটরসাইকেলের ব্যবহারকে নিরাপদ করা।
চালকের দক্ষতা ও সচেতনতা বৃদ্ধি, কঠোর আইন প্রয়োগ, মানসম্পন্ন হেলমেট নিশ্চিত করা, নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো তৈরি এবং ভারী যানবাহনের দায়িত্বশীল চলাচল—এই বিষয়গুলো একসঙ্গে কার্যকর করা গেলে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
মন্তব্য