খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৮ই আগস্ট ২০২৬, ৫:৪০ পিএম

ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে আয়োজিত ‘সঙস অব দ্য মনসুন রেভল্যুশন’ কনসার্টে গান পরিবেশনের সময় তাঁকে লক্ষ্য করে বোতল ছোড়ার ঘটনায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ব্যান্ড আরকের প্রধান কণ্ঠশিল্পী হাসান। তবে ঘটনার জন্য ক্ষোভ বা প্রতিশোধের পথ বেছে না নিয়ে ক্ষমার মনোভাব দেখানোর কথা জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে দেশের কোনো শিল্পীকে যেন মঞ্চে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ও অসম্মানজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়, সে আহ্বানও জানিয়েছেন জনপ্রিয় এই গায়ক।
৫ আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে ‘সঙস অব দ্য মনসুন রেভল্যুশন’ শীর্ষক কনসার্টের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে আরকের পরিবেশনার সময় দর্শকসারির দিক থেকে একটি বোতল ছুড়ে মারা হয় হাসানকে লক্ষ্য করে। মঞ্চে গান পরিবেশনের সময় এমন ঘটনার ভিডিও ও আলোচনা পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি নিয়ে সংগীতাঙ্গনের অনেকেই দর্শকের এমন আচরণের সমালোচনা করেন।
ঘটনার পর রাজশাহী থেকে ঢাকায় ফিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের প্রতিক্রিয়া জানান হাসান। দীর্ঘ সংগীতজীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলা ব্যান্ড সংগীতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের পথচলায় নানা ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। কিন্তু মঞ্চে গান গাওয়ার সময় দর্শকের কাছ থেকে এভাবে বোতল ছুড়ে দেওয়ার ঘটনা তাঁর কাছে ছিল অপ্রত্যাশিত।
তবে ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে কাউকে ঘৃণা বা প্রতিশোধের দৃষ্টিতে দেখতে চান না হাসান। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল ক্ষমা ও সচেতনতার বার্তা। তিনি মনে করেন, যিনি বোতলটি ছুড়েছেন, তিনি হয়তো তাঁর কাজের সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন ছিলেন না। সে কারণেই ব্যক্তিগত ক্ষোভকে বড় করে না দেখে বিষয়টি ক্ষমার চোখে দেখতে চান তিনি।
কিন্তু ক্ষমা করে দেওয়ার অর্থ এই নয় যে এমন আচরণকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়া যায়—হাসানের বক্তব্যে সেই বিষয়টিও স্পষ্ট। একজন শিল্পী যখন মঞ্চে ওঠেন, তখন তাঁর প্রত্যাশা থাকে দর্শকের সঙ্গে সংগীতের মাধ্যমে একটি ইতিবাচক সম্পর্ক তৈরি করার। দর্শকের ভালোবাসা, হাততালি ও অংশগ্রহণ একজন শিল্পীর পরিবেশনাকে প্রাণবন্ত করে। বিপরীতে কোনো বস্তু ছোড়া, অপমান করা কিংবা শিল্পীর নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার মতো আচরণ সেই পরিবেশকে মুহূর্তেই নষ্ট করে দিতে পারে।
হাসান শিল্পী ও দর্শকের পারস্পরিক সম্মানের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, কোনো গান, পরিবেশনা কিংবা শিল্পীকে নিয়ে কারও অসন্তোষ থাকতেই পারে। দর্শকের মত প্রকাশের অধিকারও রয়েছে। কিন্তু সেই অসন্তোষ প্রকাশের ধরন এমন হওয়া উচিত নয়, যাতে একজন শিল্পীর শারীরিক নিরাপত্তা বা মর্যাদা হুমকির মুখে পড়ে।
শিল্পীদের রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বিচার করার প্রবণতারও সমালোচনা করেছেন আরকের এই গায়ক। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, একজন শিল্পীর দীর্ঘ কর্মজীবনকে কোনো নির্দিষ্ট সময়, অনুষ্ঠান বা রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্যে আটকে দেখা ঠিক নয়। একজন শিল্পী কয়েক বছরের জন্য শিল্পী নন; তাঁর পরিচয় ও সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে দীর্ঘ জীবনের পথচলা জড়িয়ে থাকে।
হাসান মনে করিয়ে দিয়েছেন, শিল্পীরা বিভিন্ন সময়ে সরকারি, বেসরকারি কিংবা রাজনৈতিক নানা আয়োজনে গান পরিবেশন করে থাকেন। কোনো একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া বা কোনো নির্দিষ্ট সময়ে কোথাও উপস্থিত থাকার ভিত্তিতে একজন শিল্পীকে স্থায়ীভাবে একটি রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করা সমীচীন নয়। শিল্পীর সংগীত, সৃজনশীলতা ও দীর্ঘ ক্যারিয়ারকে আলাদা দৃষ্টিতে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
কনসার্টে শিল্পীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিও সামনে এনেছেন হাসান। একটি সফল আয়োজনের জন্য শুধু জনপ্রিয় শিল্পী, ভালো সংগীত কিংবা বিপুল দর্শকসমাগম যথেষ্ট নয়। মঞ্চে থাকা শিল্পী ও সংগীতশিল্পীদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা আয়োজকদের অন্যতম দায়িত্ব। একই সঙ্গে দর্শকদেরও দায়িত্ব রয়েছে এমন কোনো আচরণ না করা, যাতে অনুষ্ঠান বিঘ্নিত হয় কিংবা শিল্পীর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের ঘটনার পরও সংগীত থেকে দূরে সরে যাননি হাসান। পরদিন, ৬ আগস্ট রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত একটি কনসার্টে অংশ নেন তিনি ও তাঁর ব্যান্ড আরক। এতে বোঝা যায়, অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পরও মঞ্চ ও সংগীতের প্রতি তাঁর দীর্ঘদিনের দায়বদ্ধতা অটুট রয়েছে।
হাসানের বক্তব্য তাই শুধু একটি ব্যক্তিগত ঘটনার প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর মধ্য দিয়ে কনসার্টে শিল্পী ও দর্শকের সম্পর্ক, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং মঞ্চের নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও সামনে এসেছে। একজন শিল্পী দর্শকের সামনে দাঁড়ান গান শোনাতে, ভালোবাসা ভাগ করে নিতে এবং মানুষকে বিনোদন দিতে। সেই মঞ্চ যেন কোনোভাবেই অপমান, বিশৃঙ্খলা বা নিরাপত্তাহীনতার জায়গায় পরিণত না হয়—এটাই তাঁর প্রত্যাশা।
হাসানের অবস্থানও স্পষ্ট: অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের জবাব প্রতিশোধ দিয়ে নয়, বরং সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে দেওয়া উচিত। তবে একই সঙ্গে ভবিষ্যতে কোনো শিল্পীকে যেন মঞ্চে দাঁড়িয়ে বোতল নিক্ষেপ কিংবা এ ধরনের অসম্মানজনক আচরণের মুখোমুখি হতে না হয়, সে বিষয়ে আয়োজক ও দর্শক—উভয় পক্ষকেই আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।
মন্তব্য