দুর্নীতি, শেয়ারবাজারে কারসাজি, অর্থ আত্মসাৎ ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক সাকিব আল হাসানসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ আবারও পিছিয়েছে। আদালত আগামী ২৭ জুলাইয়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
বুধবার (২০ মে) ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন উপস্থাপনের দিন নির্ধারিত ছিল। তবে নির্ধারিত সময়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রতিবেদন দাখিল করতে না পারায় বিচারক মো. সাব্বির ফয়েজ নতুন তারিখ ধার্য করেন। আদালত সূত্র জানিয়েছে, আর্থিক লেনদেনের জটিলতা, বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র বিশ্লেষণের কাজ এখনো চলমান থাকায় তদন্ত সংস্থা অতিরিক্ত সময়ের আবেদন করে।
মামলাটি দেশের শেয়ারবাজারে বহুল আলোচিত কারসাজি, কৃত্রিমভাবে শেয়ারের মূল্য বৃদ্ধি এবং সংঘবদ্ধ আর্থিক অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে দায়ের করা হয়। দুদকের সহকারী পরিচালক সাজ্জাদ হোসেন গত বছরের ১৭ মে মামলাটি দায়ের করেন। পরে একই বছরের ১৬ জুন আদালত সাকিব আল হাসানের বিদেশ গমনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, অভিযুক্তরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন বিও (বেনিফিশিয়ারি ওনার্স) হিসাব ব্যবহার করে শেয়ারবাজারে সমন্বিত লেনদেন পরিচালনা করতেন। অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজারে অতিরিক্ত চাহিদার পরিবেশ সৃষ্টি করা হতো। এর মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের উচ্চমূল্যে শেয়ার কিনতে উৎসাহিত করা হয়। পরে অভিযুক্তরা নিজেদের শেয়ার বিক্রি করে বিপুল মুনাফা অর্জন করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদকের এজাহারে বলা হয়, এ ধরনের কারসাজির কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন। তদন্ত নথিতে প্রায় ২৫৬ কোটি ৯৭ লাখ ৭০ হাজার ৩০৪ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। যদিও এসব অর্থকে “অস্বাভাবিক মূলধনী মুনাফা” হিসেবে দেখানো হয়েছিল, তদন্তকারী সংস্থার দাবি—এটি প্রকৃতপক্ষে অপরাধলব্ধ আয়।
মামলার অন্যতম আসামি সমবায় অধিদপ্তরের উপ-নিবন্ধক আবুল খায়ের ওরফে হিরুর বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ সন্দেহজনক ব্যাংক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তার নামে থাকা ১৭টি ব্যাংক হিসাবে ৫৪২ কোটি ৩১ লাখ ৫১ হাজার ৯৮২ টাকার অস্বাভাবিক লেনদেন শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া তার স্ত্রী কাজী সাদিয়া হাসানের সহায়তায় প্রায় ২৯ কোটি ৯৪ লাখ ৪২ হাজার টাকা বিভিন্ন খাতে স্থানান্তরের মাধ্যমে অর্থ পাচারের অভিযোগও রয়েছে।
তদন্ত নথিতে আরও বলা হয়েছে, প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্স, ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স এবং সোনালী পেপারসের শেয়ারে কারসাজির ঘটনায় সাকিব আল হাসানের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি বাজার কারসাজির মাধ্যমে প্রায় ২ কোটি ৯৫ লাখ ২ হাজার ৯১৫ টাকা মুনাফা অর্জন করেন। এসব অর্থ “রিয়ালাইজড ক্যাপিটাল গেইন” হিসেবে দেখানো হলেও দুদকের ভাষ্য অনুযায়ী তা অবৈধভাবে অর্জিত আয়।
মামলার অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন কাজী সাদিয়া হাসান, আবুল কালাম মাদবর, কনিকা আফরোজ, মোহাম্মদ বাশার, সাজেদ মাদবর, আলেয়া বেগম, কাজী ফুয়াদ হাসান, কাজী ফরিদ হাসান, জাভেদ এ মতিন, জাহেদ কামাল, হুমায়ূন কবির এবং তানভির নিজাম।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের শেয়ারবাজারে দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধ কারসাজি ও কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধির অভিযোগ বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এ ধরনের মামলার তদন্ত ও বিচার দ্রুত সম্পন্ন হলে বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
নিচে মামলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| মামলার ধরন | দুর্নীতি, শেয়ারবাজার কারসাজি ও অর্থ পাচার |
| প্রধান অভিযুক্ত | সাকিব আল হাসানসহ ১৫ জন |
| মামলা দায়েরের তারিখ | গত বছরের ১৭ মে |
| মামলার বাদী | দুদকের সহকারী পরিচালক সাজ্জাদ হোসেন |
| তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নতুন তারিখ | ২৭ জুলাই |
| অভিযোগকৃত আত্মসাতের পরিমাণ | প্রায় ২৫৬ কোটি ৯৭ লাখ টাকা |
| সন্দেহজনক ব্যাংক লেনদেন | ৫৪২ কোটির বেশি |
| অভিযোগকৃত অর্থ পাচার | প্রায় ২৯ কোটি ৯৪ লাখ টাকা |
| সাকিবের বিরুদ্ধে অভিযোগ | বাজার কারসাজিতে অংশগ্রহণ ও অবৈধ মুনাফা অর্জন |
